জিম্মি জাহাজটির দায়িত্বে নতুন জলদস্যু দল

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ১৫ মার্চ, ২০২৪
  • ৬০ দেখা হয়েছে

# ২৩ নাবিক সুস্থ আছেন ।। ইইউ জাহাজের প্রতিরোধ চেষ্টা, দুইপক্ষে গুলি বিনিময় মন্ত্রণালয়ে সমন্বয় সভা, জিম্মিদের উদ্ধারে যোগাযোগের অপেক্ষা
ডেস্ক রির্পোট:- ভারত মহাসাগরে সোমালিয়া জলদস্যুদের কবলে পড়া বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি আবদুল্লাহ’ গতকাল সোমালিয়া উপকূলে নোঙর করেছে। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫শ’ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিয়ে গতকাল দুপুরে জাহাজটি সোমালিয়া উপকূলে নোঙর করে।

এরপর ২৩ নাবিকসহ জাহাজটিকে দ্বিতীয় পক্ষের হাতে হস্তান্তর করে জলদস্যুদের প্রথম গ্রুপটি জাহাজ থেকে নেমে যায়। এরপর শুরু হবে দর কষাকষি বা দাবি আদায়ের চেষ্টা। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত জলদস্যুদের সাথে কোন ধরনের যোগাযোগ হয়নি। তারা কোন দাবিও এখন পর্যন্ত করেনি। এদিকে গতকাল অপর একটি জাহাজ থেকে জলদস্যুদের প্রতিরোধ করে জিম্মিদের উদ্ধার করার চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি। দুই জাহাজের মধ্যে গুলি বিনিময় হয়েছে। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। জিম্মি নাবিকদের সাথে জলদস্যুরা ভালো আচরণ করছে বলে জানিয়ে নাবিকদের উদ্বৃতি দিয়ে জাহাজটির মালিকপক্ষ এসআর শিপিং এর পক্ষ থেকে বলা হয়– নাবিকদেরকে সেহ্‌রি এবং ইফতার ঠিকঠাকভাবে করতে দেয়া হয়েছে।

গত মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে কেএসআরএম গ্রুপের এসআর শিপিংয়ের মালিকানাধীন এমভি আবদুল্লাহ নামের জাহাজটির পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয় সোমালিয়ার জলদস্যুরা। গতকাল বাংলাদেশ সময় দুপুর ৩টার দিকে ‘এমভি আবদুল্লাহ’ সোমালিয়ার উপকূল হতে ৭ নটিক্যাল মাইল দূরে নোঙর করে। জাহাজ পরিচালনায় নাবিকরাই সব দায়িত্ব পালন করছেন। দস্যুরা শুধু অস্ত্র হাতে পাহারা দিচ্ছে। নোঙর করতে জাহাজের সম্মুখভাগে গিয়েছিলেন চিফ অফিসার, সারেং এবং একজন সাধারণ নাবিক।

নোঙরের পর সোমালিয়া হতে ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ ১৫–২০ জনের নতুন একটি দস্যু দল জাহাজটির দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে। এদের সাথে একজন ইংরেজি জানা ইন্টারপ্রিটারও রয়েছে। জলদস্যুদের মূল ভাষা সোমালি আর আরবী।

জাহাজের অবস্থানরত সবাই শারীরিকভাবে সুস্থ আছে। তারা সেহ্‌রি, ইফতার করছেন আর ব্রিজে জামাতে নামাজও আদায় করছেন। জাহাজের চিফ কুক আরেকজনকে সাথে নিয়ে প্রায় ৫০ জনের জন্য ২–৩ বেলা রান্না করছেন। নাবিকরা কম করে খেলেও জলদস্যুরা ভরপেট খাচ্ছে। গতকাল সবাই ব্রিজে থাকলেও আজ সবাইকে দিনের বেলা কেবিনে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

এতে জাহাজের খাবার আর পানির যে ব্যবহার সেটা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আগে যে খাবার ২৫ দিন যাবে বলা হয়েছিল, সেই খাবার ১১–১২ দিন পরেই শেষ হয়ে যাবে। ২০০ টন পানি শেষ হয়ে গেলে রেশনিং বা ব্যয় সংকোচন শুরু হবে। জলদস্যুরা খাবার এবং পানি কমিয়ে দেবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন নৌ বাহিনীর জাহাজ ইউরোফোর আটলান্টিক থেকে গুলি করার পর পাল্টা গুলি ছোড়া এবং জিম্মিদের হত্যা করার হুমকির মুখে নেভির জাহাজটি পিছু হটে। জাহাজটি পিছু হটে ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান নিয়েছে। ওই যুদ্ধ জাহাজ হতে একটি হেলিকপ্টারও টেক অফ করে এমভি আবদুল্লাহকে কয়েকবার চক্কর দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে একটা ভারতীয় যুদ্ধ জাহাজও এর সাথে যোগ দিয়েছে। দুটো জাহাজই সোমালিয়া কোস্ট পর্যন্ত ফলো করে এসেছে এবং কাছাকাছি অবস্থান করছে। তবে এতে দস্যুদের আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে জাহাজের এক নাবিকের উদ্বৃতি দিয়ে স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন নৌ বাহিনীর পক্ষ থেকে এমভি আবদুল্লাহকে উদ্ধারে সোমালিয়া কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নৌ বাহিনী ভারত মহাসাগরে জলদস্যুতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

এদিকে গতকাল সকালে জাহাজটির এক নাবিকের সাথে কেএসআরএম গ্রুপের সর্বশেষ যোগাযোগ হয়। ওই নাবিক বলেছেন, দস্যুরা এখন পর্যন্ত নাবিকদের সাথে কোনো ধরনের খারাপ আচরণ করেনি। তাদের খাবার ও পানি ঠিকঠাকভাবে দেয়া হচ্ছে। তারা সবাই সুস্থ আছেন।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলেছে যে, প্রথম গ্রুপের দস্যুদের সকলেই আজ জাহাজ থেকে নেমে চলে যায়। দ্বিতীয় গ্রুপ জাহাজে উঠে জিম্মিদের দায়িত্ব নিয়েছে। এর পর তৃতীয় গ্রুপ দর কষাকষির মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পণ দাবি করা হয়নি বলে জানিয়েছেন কেএসআরএম গ্রুপের উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার জাহান।

শাহরিয়ার জাহান বলেন, ‘আমাদের সব লক্ষ্য এখন ২৩ নাবিকের জীবন। আমরা তাদেরকে সুস্থভাবে ফিরিয়ে আনতে সকল মহলের সহায়তা চাচ্ছি। জাহাজের নাবিকেরা ভালো আছেন, সুস্থ আছেন। জলদস্যুরা নাবিকদের কোনও ক্ষতি করেনি। তাদের যাতে কোনও ক্ষতি না হয় আমরা সে চেষ্টাই করছি।’

অপরদিকে নাবিকদের অডিও কলের উদ্বৃতি দিয়ে সূত্র বলেছে, ২৩ নাবিককে একটি কেবিনে আটকে রাখা হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে জাহাজের ইন্টারনেট সংযোগও। ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে নাবিকদের কাছে থাকা মোবাইল, সঙ্গে থাকা ডলারও। তবে এসব নেয়ার সময় কোনো ধরনের খারাপ ব্যবহার করা হয়নি বলেও নাবিকেরা জানান।

উল্লেখ্য, এসআর শিপিংয়ের মালিকানাধীন বাংলাদেশী পতাকাবাহী এমভি আবদুল্লাহ জাহাজটি গত ৪ মার্চ ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে আফ্রিকার মোজাম্বিকের মাপুটো বন্দর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দরের পথে যাত্রা করে। জাহাজটির ১৯ মার্চ গন্তব্যে পৌঁছার কথা ছিল। কিন্তু পথিমধ্যে ভারত মহাসাগরে জাহাজটি সোমালিয়ার দস্যুদের কবলে পড়ে। অপর একটি ফিশিং ভ্যাসেল নিয়ে উপকূল থেকে প্রায় ৫শ’ নটিক্যাল মাইল দূরে গভীর সাগরে গিয়ে দস্যুরা এমভি আবদুল্লাহকে ছিনতাই করে। এসআর শিপিংয়ের বহরে যুক্ত হওয়ার আগে ‘এমভি আবদুল্লাহ’র নাম ছিল ‘এমভি গোল্ডেন হক’। ২০১৬ সালে তৈরি বাল্ক কেরিয়ারটির দৈর্ঘ্য ১৮৯ দশমিক ৯৩ মিটার এবং প্রস্থ ৩২ দশমিক ২৬ মিটার। গত বছর জাহাজটি এসআর শিপিং কিনে নেয়। প্রায় ৬০ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজটি বিভিন্ন ধরনের খোলা পণ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক নানা গন্তব্যে যাতায়াত করে। এসআর শিপিংয়ের বহরে মোট ২৩টি জাহাজ রয়েছে।

এর আগে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে এই গ্রুপের সমুদ্রগামী জাহাজ এমভি জাহান মনি আরব সাগরে সোমালীয় দস্যুদের কবলে পড়েছিল। ওই সময় ২৫ নাবিক ছাড়াও চিফ ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রীও এমভি জাহান মনি জাহাজে অবস্থান করছিলেন। নানাভাবে চেষ্টা এবং বিপুল অংকের অর্থ পরিশোধের পর ১০০ দিনের মাথায় সোমালিয়ার কুখ্যাত দস্যুরা জাহাজটি মুক্ত করে দিয়েছিল।

এবারও কি হতে যাচ্ছে তা জানতে আরো দুয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে। দস্যুদের পক্ষ থেকে যোগাযোগ না করা পর্যন্ত নাবিকদের মুক্তি বা জাহাজটিকে মুক্ত করার আলোচনা খুব বেশি এগুবে না বলেও সূত্র মন্তব্য করেছে।

এদিকে গতকাল ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বেলা ১১টায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও এজেন্সি কর্তৃপক্ষ, মার্চেন্ট মেরিন অ্যাসোসিয়েশন, জাহাজের মালিকপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সোমালীয় জলদস্যুদের হাতে জিম্মি জাহাজ ও ক্রুদের নিরাপদে উদ্ধারের কর্মকৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বৈঠক শেষে নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক কমডোর মোহাম্মদ মাকসুদ আলম বলেন, জাহাজটি সোমালিয়া উপকূল থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে নোঙর করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কয়েকদিনের মধ্যেই জলদস্যুরা মালিকপক্ষের সাথে যোগাযোগ করবে। এরপরই নাবিকদের উদ্ধারে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা হবে। বৈঠকের সভাপতি রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, জাহাজটির বীমাকারী প্রতিষ্ঠান বিএনআই ক্লাব, পাইরেন্সি সেন্টারসহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। জলসদস্যুরা চাপ বাড়াবে নানা বিষয়ের ওপর। যারা নেগোসিয়েশন বা দর কষাকষি করবে, তাদের সাথে যোগাযোগ হচ্ছে। খুব দ্রুত যোগাযোগ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মোহাম্মদ মাকসুদ আলম বলেন, যেহেতু এখন জাহাজটি সোমালিয়া উপকূলে নোঙর করেছে, আমরা আশা করছি, কোনো না কোনো সময়ে অপহরণকারীরা জাহাজের মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। তারপরই আমরা কৌশল ঠিক করবো, কীভাবে আলোচনায় যাবো। এখন আমরা চিন্তা করছি, জাহাজে যারা অবস্থান করছেন তারা এবং জাহাজটি যেন নিরাপদ থাকে সে বিষয়টি নিয়ে। আজাদী

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.net
Website Design By Kidarkar It solutions