শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ,২০২১

Bangla Version
  
SHARE

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১, ০৯:২৬:১১

এচ্যে বিজু

এচ্যে বিজু

রুনা তাসমিনা:- চৈত্রের প্রায় শেষের দিকে। মৃদুমন্দ বাতাস যেন ছড়িয়ে দিচ্ছে আনন্দ বার্তা। আসছে বিজু। মাত্র দুটি দিন মাঝখানে। পার্বত্য অন্যান্য অঞ্চলের মতো রাঙ্গামাটির রুপকারি গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ। বিজু উৎসবের আর বেশি দেরি নেই। আইয়ু আর ধ্রীতার মনেও লেগেছে আনন্দের ঢেউ। নতুন এই দম্পতির বিয়ে হয়েছে বেশী দেরি হয়নি। আইয়ুর সাথে প্রথম বিজু। ধ্রীতার মনে তাই অনেক আনন্দ। বছর ঘুরে আবার আসছে সেই দিন, যেদিন আশেপাশের মহল্লার সবাই উৎসবে মেতে উঠবে। এই একটি উৎসবে আশেপাশের মহল্লার সবাই এসে জড়ো হবে। যখন ওরা সবাই একসাথে জড়ো হয় তখন উৎসবের নাম পাল্টে হয় বৈসাবি। শুধু ধ্রীতার মন নয়, আনন্দের জোয়ারে ভাসছে পাহাড়ি সবকটি মহল্লা। চারিদিকে পড়ে গেছে সাজ সাজ রব। সবাই ব্যস্ত বিজুর জন্যে পিনন কাদি তৈরীতে। উৎসব করে ওরা বিদায় জানায় পুরনো বছরকে। ঘরে ঘরে পড়ে মাছ শুকানো, পাঁচনের জন্যে তরকারি,লতা-পাতা জোগাড়, পিঠা বানানোর ধুম। পিনন কাদি তৈরী হয়ে গেছে তবুও ধ্রিতাকে প্রথম বছরে আরো কিছু কিনে দিতে চায় আইয়ু। সে এমনই। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের ঢালুতে বসে সখি প্রচেতার সাথে গল্প করছিল। আইয়ুর ডাক শুনে নেমে আসে পাহাড়ের নীচে। অসময়ে আইয়ুকে এখানে দেখে ধ্রীতা বুঝতে পারে নিশ্চয় জরুরি কিছু। নীচে নামার সাথে সাথে হাত ধরে বলে, যেই ধ্রীতা। বাজারত যেই। ইক্কুনু! ঘরত এবো রানা বারা হিচ্চু ন অয়। হেল্লে যেই? ঘরের কাজ ফেলে এই মুহুর্তে বাজারে যেতে মন চাইছে না ধ্রীতার। না। বেক্কুনর বাজার গরা অই জিয়ে তরে মুই এব হিচ্চু হিনি দি ন পারং। যেই ইক্কুই যেই। আইয়ুর কথা শুনে হেসে দেয় ধ্রীতা। পাশাপাশি ভালোলাগায় মন ভরে যায়। এই মানুষটি প্রচন্ড রকম ভালোবাসে তাকে। শুনেছে আইয়ু খুব রাগী। পরিবারের লোকজন তো আছেই, মহল্লার লোকেরাও তার রাগ সম্পর্কে জানে। কিন্তু ধ্রীতা শুধু তার ভালোবাসাটাই দেখেছে। রাগের যে বদনাম আইয়ুর আছে, সে রাগ বিয়ের ছয় মাস চলে গেলেও ধ্রীতা একবারের জন্যেও দেখেনি। তবে এটুকু বুঝেছে আইয়ু যখনই কোন কাজ করবে বলে ঠিক করে, সে তা করবেই। তাই ধ্রীতা আর কথা না বাড়িয়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল শনের ছাউনি দেয়া কাঠের মাচার জুমঘরে। হাটে যাওয়ার জন্যে তৈরি হতে হবে। মুখে সামান্য পাউডারের প্রলেপ,চোখে কাজল লাগিয়ে,ঠোঁটে লিপস্টিক ছোঁয়াতেই আইয়ু এসে দাঁড়ায় পেছনে। ও পরানি , তরে হুব দোল লাগের। মর হুব নাক অজল অয় ত দুক্কেন দোল মিলে ম মোক। আইয়ুর মুখে রুপের তারিফ প্রতিদিনই শোনে ধ্রীতা। তবুও খুব ভালো লাগে। মুখে হাসি নিয়ে আইয়ুকে তাড়া দেয় হাটে যাওয়ার। পাহাড়ের আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে দুজনে হাটে এসে পৌঁছুয়। মানুষে গিজগিজ করছে দোকানগুলো। কেনাকাটায় ব্যাস্ত সবাই এ দোকান সে দোকান ঘুরে কিনছে পছন্দের জিনিষ। আইয়ুও চায় ধ্রীতাকে বাজারের সবচেয়ে সুন্দর গয়না, খাড়ু, কিনে দেবে। অনেক ঘুরার পর একটি দোকানে বসে দু’জন। দোকানদার নানা ধরনের মুদ্রার গয়না,পয়জে মালা,পুতির গয়না দেখায়। ধ্রীতা লজ্জায় বলতে পারে না কিছুই। আইয়ু বার বার জিজ্ঞেস করে কোনগুলো তার পছন্দ? ধ্রীতার মুখ ফুটে বলতে লজ্জা লাগে। আয়ুকে বলে, তুই তর আওজ মত হিনি দে। এদক দিন দ নিজ মন মত সুল্লুম্মোই বিজু গুচ্চোং। এবার ত পছন্দ মত হাবোর লোই বিজু গরিম। দুই তিনদিন ধরে উৎসব চলবে। ঘরে আসবে অনেক মেহমান। আইয়ু চায় ধ্রীতাকে সবার চেয়ে সুন্দরী লাগুক। ঘরে বানানো হলেও সে আরো এক সেট পিনন কাদি কিনে নেয়। হাটের আরো দোকান ঘুরে কিনে নেয় মুদ্রার গয়না, পয়জে মালা,পুতির গয়না। ননদ সুতপা, শ্বাশুড়ির জন্যেও কেনা হয়। হাটে আসার সময় আইয়ুর মা বলে দিয়েছে পাঁচনের বাজারও করে নিয়ে যেতে। বাজার ঘুরে পাঁচনের জন্য নানা পদের সবজি। বাজার শেষে দুজন আরো কিছুক্ষণ বাজারে ঘুরে ঘুরে দেখে অন্যদের কেনাকাটা। সন্ধ্যা একটু গাঢ় হতেই যখন দোকানিরা কুপিগুলো নেভানো শুরু করে বাড়ির পথ ঘরে দুই যুগল। ঘরে ফিরতে রাত হয়ে যায়। আইয়ুর জন্যেও ধ্রীতার পছন্দে কেনা হয় লুঙ্গি,ফতুয়া। বাজার থেকে ফিরে শ্বাশুড়ির সাথে বসে রান্নাটা সেরে নেয় ধ্রীতা। রাতের খাবার খেয়ে কুপি নিভিয়ে শুয়ে পড়ে দুজনেই। পাহাড়ি বুনো ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে রাতকে করে তোলে মাতাল। বিছানায় শুয়ে ধ্রিতার হাতের আঙুল নিজ হাতের মধ্যে নিয়ে আইয়ু নাড়াচাড়া করতে থাকে। আকাশে চাঁদ নেই। কিন্তু পাহাড়ি ঘরগুলো উঁচুতে হওয়ায় তারার আলোয় ঘরের ভেতরেও তৈরি করছে এক মায়াবী পরিবেশ। হাবর আন মনত পজ্জে ধ্রীতা তর? মেলার পর বেগ পল্যে বিজু ইবি আমার। মুই চাং তরে বেক্কুনত্তুন বেজ দোল লাগোক। আইয়ুর কথায় হেসে আরেকটু ঘনিষ্ট হয়ে ধ্রীতা অন্য হাতে আইয়ুর হাত চেপে ধরে বলে, হুউব! ধ্রীতার আবেগঘন কণ্ঠে আনন্দের সুর বুঝতে পারে আইয়ু। মনটা খুশি হয়ে উঠে। গত বছরের চৈত্রের শেষে বিজু উৎসবের প্রথমদিন খুলকামিং পূজায় মেয়েদের ভিড়ে ধ্রীতাকে দেখেছিল আইয়ু। প্রতিবার জলদেবতার পূজা দেখার চেয়ে তরুণরা ভীড় জমায় তরুণীদের দেখার জন্যে। আজও কাঁচা লং নদীর তীর লোকে লোকারণ্য। আওইয়ুও এসে দাঁড়িয়েছে সবার সাথে। সকালের আলো ফুটতেই দল বেঁধে বেঁধে তরুণিরা আসতে শুরু করে নদীর পাড়ে। সুন্দর করে সেজেছে সবাই। হাতে কলাপাতায় করে ফুল নিয়ে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে নদীর কিনারে। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় ওরা সবাই মিলে জলদেবতার উদ্দেশ্যে নদীর পানিতে ভাসীয়ে দেয় ফুলগুলো। ফুল বিসর্জন দিয়েই দেবতাকে প্রনাম জানাচ্ছিল তরুণীর দল। আইয়ুর চোখ আটকে যায় লাল পিনন কাদি পড়া একটি মেয়ের উপর। সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে মুখে। ফর্সা মুখ রোদ লেগে গোলাপী হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে সাক্ষাত এক প্রতিমা নদীর পাড়ে উঠে এসেছে। ফুলপূজা শেষ করেই সবাই নেমে যায় নদীতে স্নান করতে। পানির আবরণে নতুন বছরের জন্যে গায়ে জড়িয়ে নেয় স্নিগ্ধতা,শান্তি। ডুবের সাথে অতীতের সমস্ত দুঃখ,জরা রেখে দেয় নদীর পানিতে। বিজুগুল খেয়ে পানির উপর ভেসে উঠতেই নজর যায় আইয়ুর দিকে। কেমন মোহাচ্ছন্ন হয়ে তাকিয়ে আছে ধ্রীতার দিকে। চোখে চোখ পড়তেই মিষ্টি হেসে পানি থেকে উঠে দ্রুত হাঁটতে শুরু করে বাড়ির দিকে পায়ের নূপুর জোড়ায় মৃদু রুমঝুম শব্দ তুলে। আইয়ু মুগ্ধতা নিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে তার চলে যাওয়া। আইয়ুর বাড়ি তুলবান পাড়ায়। উৎসবের আমেজ কেটে যেতেই অঅ আপনি পাঠিয়েছেন এচ্যে বিজু রুনা তাসমিনা চৈত্রের প্রায় শেষের দিকে। মৃদুমন্দ বাতাস যেন ছড়িয়ে দিচ্ছে আনন্দ বার্তা। আসছে বিজু। মাত্র দুটি দিন মাঝখানে। পার্বত্য অন্যান্য অঞ্চলের মতো রাঙ্গামাটির রুপকারি গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ। বিজু উৎসবের আর বেশি দেরি নেই। আইয়ু আর ধ্রীতার মনেও লেগেছে আনন্দের ঢেউ। নতুন এই দম্পতির বিয়ে হয়েছে বেশী দেরি হয়নি। আইয়ুর সাথে প্রথম বিজু। ধ্রীতার মনে তাই অনেক আনন্দ। বছর ঘুরে আবার আসছে সেই দিন, যেদিন আশেপাশের মহল্লার সবাই উৎসবে মেতে উঠবে। এই একটি উৎসবে আশেপাশের মহল্লার সবাই এসে জড়ো হবে। যখন ওরা সবাই একসাথে জড়ো হয় তখন উৎসবের নাম পাল্টে হয় বৈসাবি। শুধু ধ্রীতার মন নয়, আনন্দের জোয়ারে ভাসছে পাহাড়ি সবকটি মহল্লা। চারিদিকে পড়ে গেছে সাজ সাজ রব। সবাই ব্যস্ত বিজুর জন্যে পিনন কাদি তৈরীতে। উৎসব করে ওরা বিদায় জানায় পুরনো বছরকে। ঘরে ঘরে পড়ে মাছ শুকানো, পাঁচনের জন্যে তরকারি,লতা-পাতা জোগাড়, পিঠা বানানোর ধুম। পিনন কাদি তৈরী হয়ে গেছে তবুও ধ্রিতাকে প্রথম বছরে আরো কিছু কিনে দিতে চায় আইয়ু। সে এমনই। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের ঢালুতে বসে সখি প্রচেতার সাথে গল্প করছিল। আইয়ুর ডাক শুনে নেমে আসে পাহাড়ের নীচে। অসময়ে আইয়ুকে এখানে দেখে ধ্রীতা বুঝতে পারে নিশ্চয় জরুরি কিছু। নীচে নামার সাথে সাথে হাত ধরে বলে, যেই ধ্রীতা। বাজারত যেই। ইক্কুনু! ঘরত এবো রানা বারা হিচ্চু ন অয়। হেল্লে যেই? ঘরের কাজ ফেলে এই মুহুর্তে বাজারে যেতে মন চাইছে না ধ্রীতার। না। বেক্কুনর বাজার গরা অই জিয়ে তরে মুই এব হিচ্চু হিনি দি ন পারং। যেই ইক্কুই যেই। আইয়ুর কথা শুনে হেসে দেয় ধ্রীতা। পাশাপাশি ভালোলাগায় মন ভরে যায়। এই মানুষটি প্রচন্ড রকম ভালোবাসে তাকে। শুনেছে আইয়ু খুব রাগী। পরিবারের লোকজন তো আছেই, মহল্লার লোকেরাও তার রাগ সম্পর্কে জানে। কিন্তু ধ্রীতা শুধু তার ভালোবাসাটাই দেখেছে। রাগের যে বদনাম আইয়ুর আছে, সে রাগ বিয়ের ছয় মাস চলে গেলেও ধ্রীতা একবারের জন্যেও দেখেনি। তবে এটুকু বুঝেছে আইয়ু যখনই কোন কাজ করবে বলে ঠিক করে, সে তা করবেই। তাই ধ্রীতা আর কথা না বাড়িয়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল শনের ছাউনি দেয়া কাঠের মাচার জুমঘরে। হাটে যাওয়ার জন্যে তৈরি হতে হবে। মুখে সামান্য পাউডারের প্রলেপ,চোখে কাজল লাগিয়ে,ঠোঁটে লিপস্টিক ছোঁয়াতেই আইয়ু এসে দাঁড়ায় পেছনে। ও পরানি , তরে হুব দোল লাগের। মর হুব নাক অজল অয় ত দুক্কেন দোল মিলে ম মোক। আইয়ুর মুখে রুপের তারিফ প্রতিদিনই শোনে ধ্রীতা। তবুও খুব ভালো লাগে। মুখে হাসি নিয়ে আইয়ুকে তাড়া দেয় হাটে যাওয়ার। পাহাড়ের আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে দুজনে হাটে এসে পৌঁছুয়। মানুষে গিজগিজ করছে দোকানগুলো। কেনাকাটায় ব্যাস্ত সবাই এ দোকান সে দোকান ঘুরে কিনছে পছন্দের জিনিষ। আইয়ুও চায় ধ্রীতাকে বাজারের সবচেয়ে সুন্দর গয়না, খাড়ু, কিনে দেবে। অনেক ঘুরার পর একটি দোকানে বসে দু’জন। দোকানদার নানা ধরনের মুদ্রার গয়না,পয়জে মালা,পুতির গয়না দেখায়। ধ্রীতা লজ্জায় বলতে পারে না কিছুই। আইয়ু বার বার জিজ্ঞেস করে কোনগুলো তার পছন্দ? ধ্রীতার মুখ ফুটে বলতে লজ্জা লাগে। আয়ুকে বলে, তুই তর আওজ মত হিনি দে। এদক দিন দ নিজ মন মত সুল্লুম্মোই বিজু গুচ্চোং। এবার ত পছন্দ মত হাবোর লোই বিজু গরিম। দুই তিনদিন ধরে উৎসব চলবে। ঘরে আসবে অনেক মেহমান। আইয়ু চায় ধ্রীতাকে সবার চেয়ে সুন্দরী লাগুক। ঘরে বানানো হলেও সে আরো এক সেট পিনন কাদি কিনে নেয়। হাটের আরো দোকান ঘুরে কিনে নেয় মুদ্রার গয়না, পয়জে মালা,পুতির গয়না। ননদ সুতপা, শ্বাশুড়ির জন্যেও কেনা হয়। হাটে আসার সময় আইয়ুর মা বলে দিয়েছে পাঁচনের বাজারও করে নিয়ে যেতে। বাজার ঘুরে পাঁচনের জন্য নানা পদের সবজি। বাজার শেষে দুজন আরো কিছুক্ষণ বাজারে ঘুরে ঘুরে দেখে অন্যদের কেনাকাটা। সন্ধ্যা একটু গাঢ় হতেই যখন দোকানিরা কুপিগুলো নেভানো শুরু করে বাড়ির পথ ঘরে দুই যুগল। ঘরে ফিরতে রাত হয়ে যায়। আইয়ুর জন্যেও ধ্রীতার পছন্দে কেনা হয় লুঙ্গি,ফতুয়া। বাজার থেকে ফিরে শ্বাশুড়ির সাথে বসে রান্নাটা সেরে নেয় ধ্রীতা। রাতের খাবার খেয়ে কুপি নিভিয়ে শুয়ে পড়ে দুজনেই। পাহাড়ি বুনো ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে রাতকে করে তোলে মাতাল। বিছানায় শুয়ে ধ্রিতার হাতের আঙুল নিজ হাতের মধ্যে নিয়ে আইয়ু নাড়াচাড়া করতে থাকে। আকাশে চাঁদ নেই। কিন্তু পাহাড়ি ঘরগুলো উঁচুতে হওয়ায় তারার আলোয় ঘরের ভেতরেও তৈরি করছে এক মায়াবী পরিবেশ। হাবর আন মনত পজ্জে ধ্রীতা তর? মেলার পর বেগ পল্যে বিজু ইবি আমার। মুই চাং তরে বেক্কুনত্তুন বেজ দোল লাগোক। আইয়ুর কথায় হেসে আরেকটু ঘনিষ্ট হয়ে ধ্রীতা অন্য হাতে আইয়ুর হাত চেপে ধরে বলে, হুউব! ধ্রীতার আবেগঘন কণ্ঠে আনন্দের সুর বুঝতে পারে আইয়ু। মনটা খুশি হয়ে উঠে। গত বছরের চৈত্রের শেষে বিজু উৎসবের প্রথমদিন খুলকামিং পূজায় মেয়েদের ভিড়ে ধ্রীতাকে দেখেছিল আইয়ু। প্রতিবার জলদেবতার পূজা দেখার চেয়ে তরুণরা ভীড় জমায় তরুণীদের দেখার জন্যে। আজও কাঁচা লং নদীর তীর লোকে লোকারণ্য। আওইয়ুও এসে দাঁড়িয়েছে সবার সাথে। সকালের আলো ফুটতেই দল বেঁধে বেঁধে তরুণিরা আসতে শুরু করে নদীর পাড়ে। সুন্দর করে সেজেছে সবাই। হাতে কলাপাতায় করে ফুল নিয়ে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে নদীর কিনারে। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় ওরা সবাই মিলে জলদেবতার উদ্দেশ্যে নদীর পানিতে ভাসীয়ে দেয় ফুলগুলো। ফুল বিসর্জন দিয়েই দেবতাকে প্রনাম জানাচ্ছিল তরুণীর দল। আইয়ুর চোখ আটকে যায় লাল পিনন কাদি পড়া একটি মেয়ের উপর। সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে মুখে। ফর্সা মুখ রোদ লেগে গোলাপী হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে সাক্ষাত এক প্রতিমা নদীর পাড়ে উঠে এসেছে। ফুলপূজা শেষ করেই সবাই নেমে যায় নদীতে স্নান করতে। পানির আবরণে নতুন বছরের জন্যে গায়ে জড়িয়ে নেয় স্নিগ্ধতা,শান্তি। ডুবের সাথে অতীতের সমস্ত দুঃখ,জরা রেখে দেয় নদীর পানিতে। বিজুগুল খেয়ে পানির উপর ভেসে উঠতেই নজর যায় আইয়ুর দিকে। কেমন মোহাচ্ছন্ন হয়ে তাকিয়ে আছে ধ্রীতার দিকে। চোখে চোখ পড়তেই মিষ্টি হেসে পানি থেকে উঠে দ্রুত হাঁটতে শুরু করে বাড়ির দিকে পায়ের নূপুর জোড়ায় মৃদু রুমঝুম শব্দ তুলে। আইয়ু মুগ্ধতা নিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে তার চলে যাওয়া। আইয়ুর বাড়ি তুলবান পাড়ায়। উৎসবের আমেজ কেটে যেতেই আইয়ুর আর দেরি সয়না। ধ্রীতার সাথে কথা বলার জন্য অস্থির হয়ে উঠে মন। প্রতিদিন বিকেলে এসে বসে থাকে কাঁচা লং নদীর তীরে ধ্রীতাকে দেখার আশায়। এমনি এক বিকেল বেলায় নদীতে জল নিতে এসে আইয়ুর সামনে পড়ে যায় ধ্রীতা। কোনরকম ভুমিকা ছাড়াই সরাসরি প্রশ্ন করে আইয়ু, তরে মর হুউব ই গম লাগে। মরে হোচপেবেনি? আইয়ুর কথায় প্রথমে থতমত খেয়ে যায় ধ্রীতা, পরক্ষণে দুষ্টূমির হাসি খেলে যায় মুখে। সাথে করে সাথে পানি নিতে আসা প্রচেতার দিকে তাকিয়ে আইয়ুর উদ্দেশ্যে বলে, এত হিজেহিচ্চে হিওর! হেল সুনিচ! কিন্তু কাল পর্যন্ত সময়টি অনেক দীর্ঘ লাগে আইয়ুর। তবুও অপেক্ষার সময় শেষে ধ্রীতার রাজী হওয়া আইয়ুর মনে এনে দেয় অনাবিল আনন্দ। কাঁচা লং নদীর পাড়ে বসে অনেক কথা হয় দুজনের। জ্যৈষ্ঠ মাসে আইয়ুর বাবা আরো কয়েকজনকে নিয়ে পান সুপারি, জোড়া নারিকেল, কয়েকরকম মিষ্টি নিয়ে ধ্রীতার বাড়িতে প্রস্তাব দিয়ে আসে। আইয়ুর মন খুশিতে ভরে উঠে যখন পরদিন ধ্রীতাদের বাড়ি থেকে রাজি হওয়ার খবর আসে। রেওয়াজ অনুযায়ী তিনপুরে বিয়ের দিন ঠিক হয়। আইয়ু, কিরিত, বিক্রম নিয়ে হাট থেকে কিনে আনে কনের পোশাক,অলংকার। ধ্রীতাদের বাড়িতে কারুকাজ করা বাঁশের তৈরী ফুল বারেং করে সব জিনিস বিয়ের আগের দিন পাঠিয়ে দেয়। চাকমা সমাজে নিয়ম না থাকার কারনে আইয়ু যেতে পারে না কনে নিয়ে আসতে। তাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে ওরা কখন বউয়ের সাজে ধ্রীতাকে নিয়ে ফিরবে। বিকেলের মধ্যেই ফিরে আসে সবাই ধ্রীতাকে নিয়ে। আইয়ুর আনন্দের সীমা নেই। আইয়ুর পিঠেপিঠি ছোটবোন সুতপা গিয়ে ধ্রীতাকে জড়িয়ে ধরে ঘরের দরজায় রাখা সুতানালী ছিঁড়ে নিয়ে একপ্রান্ত বেঁধে দেয় ধ্রীতার হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুলে অপর প্রান্ত ধরিয়ে দেয় মায়ের হাতে। যখন পাড়ার মুরুব্বি সবার সম্মতিতে নববধূ ধ্রীতা আর আইয়ুর কোমরে গামছা বেঁধে দুজনকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে দেয়, আইয়ুর খুশি ধরে না। ধ্রীতার চোখেও খুশির আভা।দুজন দুজনকে খাইয়ে দেয় সিদ্ধ ডিম মাখা ভাত। হি রে! হি ভাবর? গত বিজুত তরে পেবার আজায় এলুং আর এ বিজুত তুই মুই এক সমারে থেবং। তর হিক্কেন লাগের ধ্রীতা? কাঁঠালচাঁপার সুগন্ধ ভেসে আসছে রাতের বাতাসের সাথে। মিষ্টি সুরে ধ্রীতার উত্তর, হুউব গম। মুই হুউব হুজি। এমন সময় বাইরে খুটখাট আওয়াজ শুনে আইয়ু মাচা থেকে উঁকি মেরে দেখে ফুল চোররা এসে হাজির। তাড়াতাড়ি ঘরে এসে ধ্রীতাকে হাত ধরে টানতে টানতে বলে, যেই ধ্রীতা! বেক ফুলুন নেজেলাক্কোই! আর দেরী গরিলে হেল্লে বুদ্ধ পূজো দিবার ফুল ন পেবং। দুজনে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে আসে। ডেকে নেয় সুতপাকে ফুল তুলতে। এটা এক মজার ব্যাপার। বিজু শুরুর আগের রাতে ফুল চুরি করা। তিনজনে মিলে বেশ অনেকগুলো ফুল তুলে আনে। স্বর্ণচাঁপা, শ্বেতকাঞ্চন, সন্ধ্যামালতি, কাঁঠালচাঁপা, কাঠগোলাপ, নয়নতারা, জবা। ভোরের আলো ফোঁটার আগে থেকেই শুরু হয় নিমপাতা আর ফুল দিয়ে ঘর সাজানো। আইয়ু ধ্রীতার চুলের খোঁপায় একটি স্বর্ণচাঁপা ফুল গুঁজে দিয়ে বলে, হুলি ন ফেলেচ। তরে হুব দোল লাগের। ধ্রীতা মৃদু হেসে ফুলটি মাথায় ঠিক করে বসিয়ে নেয়। শ্বাশুড়িকে স্নান করিয়ে নতুন পিনন কাদি পরিয়ে দেয় ধ্রীতা। বুদ্ধকে ফুল পূজা দিয়েই শুরু হয় ফুল বিজুর দিন। প্রতিযোগিতা চলে কার চাইতে কে বেশি সুন্দর করে ঘর সাজাতে পারবে। ধ্রীতা আর সুতপা যখন ঘর সাজানোয় ব্যস্ত আইয়ু গিয়ে পাড়ার হাঁস, মুরগী, গরু-বাছুরের গলায় পরিয়ে দিয়ে আসে ফুলের মালা। পাঁচনের জন্য শুকিয়ে রাখা গুরসা,পাবদা, ঘন্যা মাছগুলো ধুয়ে,নেয়ে রাখে। সন্ধ্যায় ঘরের সবাই মিলে বসে সবজি কাটতে। রান্না হয় আরো কয়েক পদের তরকারি। পিঠা বানানো হয় কয়েকরকম। জাগোরার হাঁড়ি মাটির নীচ থেকে তোলা হবে ভোরে। পরদিন খুব ভোরে উঠে স্বর্ণচাঁপা, শেতকাঞ্ছন, সন্ধ্যামালতি, কাঠগোলাপ, নয়নতারা, জবা কলাপাতায় নিয়ে সুতপা, প্রচেতা, ধ্রীতা পাড়ার আরো কিছু মেয়েসহ ‘খুমকামীং পূজা’ দিতে কাঁচা লং নদীর পাড়ে এসে হাজির হয়। সাথে আইয়ু ও আছে, আছে পাড়ার ছেলে পেলেরাও। পূজা শেষে নতুন জামাকাপড় পড়ে পাড়ার ঘরে ঘরে বেড়ানোর জন্য বেরিয়ে পড়ে। সাত ঘরের পাঁচন খে্তেই হবে! সুতপার সাথে বাজি ধরে ধ্রীতা। সারাদিন আইয়ুর বন্ধু পাড়া প্রতিবেশীরাও বেড়াতে আসে ধ্রীতাদের ঘরে। এবারের পাঁচন ধ্রীতা রান্না করেছে যদিও আইয়ুর মা দেখিয়ে দিয়েছে। মেহমানরা খেয়ে খুব তারিফ করে। জাগোরা নাকি বেশ মিষ্টি হয়েছে! আনন্দ আর আড্ডায় শেষ হয় ফুল বিজু। পরেরদিন থেকে শুরু হবে নতুন বছর। সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত ধ্রীতা,আইয়ু বসে আছে মাচার বাইরের খোলা জায়গায়। আকাশের তারাগুলো মিটমিট করে জ্বলছে। দু’জনের চোখেই নতুন বছরের স্বপ্ন। বছরের প্রথমদিন ঘর থেকে বের হওয়ার কোন নিয়ম নেই। তাই আজ কোন কাজের চাপও নেই কারও। আজকের দিন গোর্য্যাপোর্য্যার। কেবল শুয়ে বসে কাটানো। সন্ধ্যায় মন্দিরে গিয়ে পরিবারের সবাই মিলে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করে সুন্দর একটি নতুন বছরের। বুদ্ধের মুর্তির সামনে প্রার্থণারত ধ্রীতার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আইয়ু।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?