রবিবার, ১৭ অক্টোবর ,২০২১

Bangla Version
  
SHARE

শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ০২:৪৯:৫৮

উপজেলা পরিষদের জন্য নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন

উপজেলা পরিষদের জন্য নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন

মোশাররফ হোসেন মুসা:- উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন দপ্তরের কাগজপত্র ও নথি অনুমোদনের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও’র) মাধ্যমে উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে উপস্থাপন করতে হবে- এটি সহ এ-সংক্রান্ত বিধি ও প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এর জন্য আদালতের আদেশের বিষয়টি উল্লেখ করে ইউএনওদের প্রতি সার্কুলার জারি করতে মন্ত্রি পরিষদ বিভাগের সচিবের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর’ ২০২১তারিখে হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এর আগে উপজেলা পরিষদ আইনের ৩৩ধারা চ্যালেঞ্জ করে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর উপজেলা পরিষদ এসোসিয়েশনের সভাপতি ও দুমকি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হারুন-অর-রশিদ এবং একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মনোহরদি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম খান সহ পাঁচ জন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এই রিটটি দায়ের করেন (সুত্রঃ প্রথম আলো’১৪ সেপ্টেম্বর,২০২১)। আমরা জানি, উপজেলা প্রশাসনের ১৭টি দপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপজেলা পরিষদ নামক কথিত স্থানীয় সরকারের অধীনে চাকুরি করতে বাধ্য থাকবেন এমন ঘোষণা দিয়ে চাকুরিতে যোগ দেননি। যেমনি ভাবে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের কর্মচারীরা করে থাকেন। তবে এদেশে একটি মাত্র ‘সরকার ব্যবস্থা’ বহাল থাকায় সরকার যে কোনো কর্মকর্তা/কর্মচারীকে স্থানীয় সরকারে ন্যস্ত করতে পারেন। এটি আইনতঃ অবৈধ নয়; কিন্তু নীতিগত দিক থেকে কতটুকু সঠিক তা প্রশ্ন করার অবকাশ রয়েছে। এরশাদ সরকার ১৯৮২ সালে প্রশাসনিক নীতি বিকেন্দ্রিকরণের লক্ষ্যে (গণতান্ত্রিক নীতি বিকেন্দ্রিকরণের লক্ষে নয়) ‘উপজেলা পরিষদ এবং উপজেলা প্রশাসন পুর্নগঠন’ অধ্যাদেশ জারি করেন। এ অধ্যাদেশ অনুযায়ী একজন নির্বাচিত চেয়ারম্যান, প্রতিনিধি সদস্য, অফিসিয়াল সদস্য এবং মনোনিত সদস্য নিয়ে উপজেলা পরিষদ গঠন করা হয়। ১৯৮২ সালে সরকারি রেজুলিউশন অনুযায়ী উপজেলা পর্যায়ে সরকারি কার্যাবলী মূলতঃ দু’ভাগে ভাগ করা হয়, তা হলো ১৩টি সংরক্ষিত কাজ ও ১০টি হস্তান্তরিত কাজ। এ পদ্ধতির আওতায় সংরক্ষিত ও হস্তান্তরিত কাজ সমূহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে উপজেলা পরিষদে ন্যস্ত করা হয়। তখন বিধান অনুযায়ী সংরক্ষিত বিষয়াদির কর্মকর্তাদেরকে (মুন্সেফ এবং ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া) উপজেলা পরিষদের নিকট জবাবদিহি করতে হতো। উপজেলা গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের মধ্যবর্তী স্তর হলেও এ পদ্ধতিটি নতুন হওয়ায় এর প্রয়োজনীয়তা ও অপ্রয়োজনীয়তা তেমন বোঝা যায়নি। তাছাড়া সেসময় উপজেলাতে বিপুল পরিমান অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। সে অর্থ দ্বারা উপজেলায় ন্যস্তকৃত বিভাগগুলোর অফিস, আদালত ভবন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ইত্যাদি নির্মাণ ছাড়াও উপজেলামুখী রাস্তঘাট নির্মাণ করা শুরু হয়। সরকারের এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা জড়িয়ে পড়েন। ফলে এটি স্থানীয় সরকার না কেন্দ্রীয় সরকারের মাঠ প্রশাসন সেটি বুঝে উঠতে অনেকেই সক্ষম হননি। কিন্তু ১৯৯২ সালে বিএনপি সরকার এটির বিলুপ্তি ঘোষণা করলে এটির গোমর ফাঁস হতে শুরু করে। যেমন, এ স্তরটি ইউনিয়ন পরিষদের (এবং যদি পৌরসভা থাকে তাদের) নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত পরিষদ দ্বারাও পরিচালনা করা সম্ভব - তা প্রমাণ হয়ে পড়ে। আবার স্থানীয় সরকার হতে হলে তার নিজস্ব আয়ের ব্যবস্থা থাকতে হয়। প্রথমে সে তার আয় দ্বারা অফিস খরচ নির্বাহ করবেন, নিজেদের সম্মানী ভাতা নিবেন ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করবেন। তারপর অবশিষ্ট আয় দ্বারা (প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতা নিয়ে) এলাকার উন্নয়ন সাধন করবেন। কিন্তু উপজেলার নিজস্ব কোনো আয় না থাকায় এটিকে কেন্দ্রীয় সরকার ও ইউনিয়ন পরিষদের আয়ের উপর নির্ভর করতে হয় (কোনো কোনো উপজেলার আয়তনের মধ্যে পৌরসভা থাকলেও সেখান থেকে এ স্তরটি কোনো অর্থ নিতে সক্ষম নয়)। ফলে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদগুলো দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ে। এর আগে ‘প্রকৃচি’ চেয়ারম্যানদের ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে ৫দফা দাবী আদায়ের আন্দোলন শুরু করেছিল। এখানে লক্ষনীয়, প্রকৃচির সাথে প্রশাসন ক্যাডারের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল বেতন-ভাতার বিষয় নিয়ে, কোনো কাজ নিয়ে নয়। চিকিৎসকরা স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের কি সেবা দিচ্ছেন তা বোঝার জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিকগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। তাঁরা স্থানীয় কোনো কর্তৃপক্ষের অধীনে চাকুরি করতে রাজী নন। অথচ উন্নত বিশ্বে গিয়ে তাঁরা নগর সরকারের অধীনে চাকরি করেন। উপজেলাতে ‘স্থানীয় সরকার প্রকৌশল’ নামে একটি দপ্তর রয়েছে বটে। দপ্তরটির নাম ‘স্থানীয় সরকার প্রকৌশল’ না হয়ে ‘কেন্দ্রীয় সরকার প্রকৌশল’ হওয়াই অধিক যুক্তিযুক্ত। যেহেতু এটি স্থানীয় সরকারের অধীনস্থ কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এটিতে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কর্মকর্তা/কর্মচারী রয়েছেন। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্থানীয় সরকারকে সহযোগিতার নামে এক ধরনের প্রভুত্ব কায়েম করেছেন। তবে কৃষিবিদরা কৃষকদের কাছাকাছি থেকে কিছুটা হলেও সেবা দিচ্ছেন। যেমন- উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে জড়িত থেকে চাষীদের সহযোগিতা করছেন। মানুষের যৌথভাবে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা থেকে সরকার ব্যবস্থার উৎপত্তি ঘটেছে। প্রশাসন ছাড়া সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা অসম্ভব ব্যাপার। একটি দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের উন্নয়নের জন্য দাপ্তরিক পদক্রমে শ্রেণী বিভাজিত কর্মচারি দ্বারা প্রশাসন পরিচালিত করতে হয়, যা আমলাতন্ত্র নামে পরিচিত। তবে বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক করার দাবি যৌক্তিক। এদেশের আয়তন, ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস-ঐতিহ্য, চিন্তা-ভাবনা ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে এদেশে দুই প্রকারের কাজ রয়েছে। তাহলো জাতীয় কাজ ও স্থানীয় কাজ। স্বাভাবিক কারণে দুই প্রকারের সরকার ব্যবস্থা, তথা কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাই বাস্তবায়ন যোগ্য। তখন জাতীয় কাজ কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য এবং যাবতীয় স্থানীয় কাজ (গ্রামীণ ও নগরীয়) স্থানীয় সরকারের জন্য (তথা জেলা সরকার, নগর সরকার, ইউনিয়ন সরকার ইত্যাদিতে) নির্দিষ্ট থাকবে। তখন স্বাভাবিক কারনে জাতীয় কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে এবং স্থানীয় কাজের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্থানীয় সরকারের অধীনে চাকরি করতে বাধ্য থাকবেন। প্রয়োজনে স্থানীয় সরকারের জন্য আলাদা ক্যাডার সার্ভিস চালু করা যেতে পারে। তাছাড়া উপজেলা স্তরটি মধ্যবর্তী ও গ্রামীণ (বেশির ভাগ গ্রামীণ-নগরীয়) হওয়ায় স্তরটি স্থায়ী নয়। সমগ্র দেশটি আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে নগর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তখন এ স্তরটি আপনা-আপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অনেকে মনে করেন, স্থানীয় সরকারের অধীনে চাকরি করা মর্যাদাহানীকর। কেননা এর প্রতিনিধিরা যথেষ্ট যোগ্য নন। মনে রাখা দরকার কাজ যেমন প্রতিনিধিও তেমন। উন্নত বিশ্বের কোনো কোনো নগর সরকারের বাজেট আমাদের গোটা দেশের বাজেটের চেয়েও বেশি। ওই বাজেট ব্যবস্থাপনার জন্য সেখানে যোগ্য নগর পিতা ছাড়াও উপযুক্ত পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী,চিকিৎসক,পরিবেশবিদ, শিক্ষাবিদ, স্বাস্থ্য পরিদর্শক সহ লক্ষাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এদেশেও সত্যিকার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা চালু হলে তখন যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিরাই স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন-তাতে কোনো সন্দেহ নেই। লেখকঃ গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক গবেষক।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?