শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ,২০২১

Bangla Version
  
SHARE

শুক্রবার, ১৬ জুলাই, ২০২১, ১২:২৩:১২

শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বন্দিজীবন ও রাজনীতির ধাঁধা

শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বন্দিজীবন ও রাজনীতির ধাঁধা

অজয় দাশগুপ্ত:- এরশাদবিরোধী আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এর আগে দুই নেত্রী বেশ কয়েকবার একসঙ্গে রাজনৈতিক কারণে কারাগারে গেলেও, ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে প্রথমবারের মতো আইনি প্রক্রিয়ায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যান। শেখ হাসিনা সর্বশেষ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই, ‘ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনে’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে। মুক্তি পান ১১ মাস পরে, ২০০৮ সালের ১১ জুন। খালেদা জিয়াও সে সময় এক বছর জেল খাটেন। তারপর প্রায় এক দশক পরে গ্রেপ্তার হন ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। খালেদা জিয়া এখন দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে তিন বছরের বেশি কারাগারে। সেনাশাসক এইচ এম এরশাদকে বাদ দিলে বাংলাদেশে একটানা এত দীর্ঘ সময় কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাকে কারাগারে থাকতে হয়নি। অন্যদিকে, শেখ হাসিনা সর্বশেষ কারামুক্তির কয়েক মাস পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন এবং একটানা ১৩ বছরের বেশি এ দায়িত্ব পালন করছেন। এ সময়ে তিনি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি ঘটাতে পেরেছেন। অনেক যুদ্ধাপরাধীকে কঠোর দণ্ড দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দর্প চূর্ণ করেছেন। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন করেছেন করোনাভাইরাসের ভয়াবহ বিপর্যয় মোকাবিলা করেই। বাগাড়ম্বরের রাজনীতিতে বিএনপি নিজেদের দাবি করে আওয়ামী লীগের চেয়েও শক্তিশালী দল হিসেবে। এটাও বলছে- জনসমর্থনে এগিয়ে তারা। কিন্তু বাস্তব দৃশ্যপট ভিন্ন। শেখ হাসিনার একের পর এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অর্জন তারা কেবল চেয়ে চেয়ে দেখছে। এটা কি ম্যাজিক? না-কি রাজনীতির ধাঁধা? কেন এ বিপর্যয়, বিএনপি নেতৃত্ব কি সেটা খতিয়ে দেখছে? না-কি সে ক্ষমতাও তাদের কমে আসছে? রাজনৈতিক অঙ্গনের পণ্ডিতরাই বা কী বলেন? বিএনপির ‘বন্ধু’ বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত তারেক রহমানকে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে নিয়ে দুই বছরের জন্য নিবিড় পড়াশোনায় আত্মনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে তার তরুণী কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের হাতে বিএনপির নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এ ‘অপরাধে’ তিনি ছাত্রদলের কর্মীদের হাতে প্রকাশ্যে নিগৃহীত হয়েছেন। প্রশ্ন উঠছে- এমন অসহিষ্ণু দলের ভবিষ্যৎ কী? খ্যাতিমান সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদের ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়- ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর আইয়ুব খান পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির পর আওয়ামী লীগ ও ন্যাপসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে। পাকিস্তানের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। জেলে তিনি দেখেন, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুুজিবুর রহমান সকাল-সন্ধ্যা সবজি বাগান, মরিচ-বেগুন ও নানা রকম মৌসুমী ফুলের চারা লাগিয়ে আনন্দেই কাল কাটাচ্ছেন। শেখ মুজিবুর রহমান আর এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। অন্য ওয়ার্ড হতে একটি ফজলি আমের চারা জোগাড় করে তিনি নিজের সেলের ছোট আঙিনায় লাগিয়েছেন এবং জেল সুপারকে বলেছেন- এ গাছের আম খেয়ে যাওয়ার জন্য তিনি মনস্থ করেছেন। শেখ মুজিবুর রহমানের মনোবল দেখে অফিসাররা পর্যন্ত অবাক হতেন। [আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ৪৬২] ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জন্য জেল-জুলুমসহ বহু ধরনের নির্যাতন নতুন কিছু ছিল না। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে বঙ্গবন্ধু অভিধায় ভূষিত শেখ মুজিবুর রহমান তার ৫৫ বছরের জীবনের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ সময় কাটিয়েছেন কারাগারে। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে পাকিস্তান আমলে যে সব গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তার পঞ্চম খণ্ডে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলর ওয়াহেদউদ্দিন আহমদ চৌধুরীর মন্তব্য ছিল নিম্নরূপ- ‘সামরিক শাসন জারির পর শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়। তিনি হতোদ্যম হয়ে পড়েছেন কিংবা মনোবল হারিয়ে ফেলেছেন, এমনটি মনে হয়নি। তিনি অন্য বন্দিদের উৎসাহ দিয়ে বলতেন, দীর্ঘদিন জেলে থাকতে আপত্তি নেই। তবে সামরিক শাসন বেশিদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। আবার আমরা মানুষের মধ্যে ফিরে যাব।’ [গোয়েন্দা প্রতিবেদন, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২] বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা শৈশব ও কৈশোরে দেখেছেন- পিতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের দুই যুগের প্রায় অর্ধেকটা সময় জেলে কাটিয়েছেন। বাকি সময় চলত সাংগঠনিক কাজ, জেলা-মহকুমা-থানা সফর কিংবা ঢাকায় থাকলে সকাল-সন্ধ্যা দলীয় অফিসে কাটত সময়। আমার একটি লেখার শিরোনাম দিয়েছিলাম- ‘বেগম মুজিবের কারাগার দেখা’। স্বামীর সঙ্গে দেখা করার জন্য কত বার যে কারাগার ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গিয়েছেন তার হিসাব রাখা কঠিন। এ সময় সঙ্গী হতো সন্তানেরা। বড় কন্যা শেখ হাসিনা থাকতেন প্রায় প্রতিটি ‘দেখা’য়। শৈশব থেকে তিনি শুনেছেন- ‘জেলের তালা ভাঙব, মুজিব ভাইকে আনব’ শ্লোগান। প্রায় আড়াই বছর জেলে থাকার পর ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তির পর গোপালগঞ্জের বাড়িতে গেলে শুনতে পান পাঁচ বছরের মেয়ে হাসিনা ৩ বছরের ভাই কামালকে সঙ্গে নিয়ে শ্লোগান দিচ্ছে- ‘জেলের তালা ভাঙব, মুজিব ভাইকে আনব।’ এ সময় বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব হেসে স্বামীকে বলেন- ‘সব সময় এ শ্লোগান শুনছে, এখন নিজেই বলছে।’ ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের সদস্যদেরসহ নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা জার্মানিতে থাকায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। কিন্তু সেনাশাসক জিয়াউর রহমান প্রায় ৬ বছর তাকে ভারত ও ইংল্যান্ডে নির্বাসিত জীবনযাপনে বাধ্য করেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি বাংলাদেশে ফেরেন। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই তিনি রাজনৈতিক নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করছেন। একইসঙ্গে ছিল প্রাণনাশের হুমকি এবং বার বার তার প্রয়োগের অপচেষ্টা। বলা যায়, দফায় দফায় প্রাণনাশের চেষ্টার মধ্যে তার বেঁচে থাকাটাই মিরাকল। এটাও যে মস্ত রাজনৈতিক ধাঁধা। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কয়েকদিনের মধ্যে ঘটে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড। এ সময় সেনাবাহিনীর বিপুল সংখ্যক অফিসারকে হত্যা করা হয়, অনেকে ছিলেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী। অনিশ্চিত ও বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিবেশেই ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জারি হয় সামরিক শাসন। ক্ষমতার দণ্ড হাতে নিয়ে এইচ এম এরশাদ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার নীতি নেন, যেমনটি করেছিলেন জিয়াউর রহমান। ১৫ অগাস্টের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যখন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী চারজন জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়, তখন আওয়ামী লীগের শত শত নেতা-কর্মী ছিলেন বিভিন্ন কারাগারে। প্রাণভয়ে অনেক নেতা দেশের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নিতে না নিতেই এইচ এম এরশাদ তাকেসহ বিপুল সংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করে আটক রাখেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে (১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৩)। অভিযোগ ছিল সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে উৎসাহপ্রদান। ১৫ অগাস্ট ও ৩ নভেম্বরের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের দুঃসহ স্মৃতি ভেসে উঠছিল ক্যান্টনমেন্টে চোখ বেঁধে রাখা বন্দিদের মধ্যে। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা ও বিভিন্ন ছাত্রাবাসে সামরিক বাহিনী অভিযান চালিয়ে কয়েকশ শিক্ষার্থীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তারাও নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়। এটাই ছিল শেখ হাসিনার প্রথম বন্দিজীবন। এ বছর (১৯৮৩) ২৯ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে ‘নিরাপত্তা হেফাজতে’ নেওয়া হয়। অভিযোগ ছিল, সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও সাধারণ নির্বাচনসহ পাঁচ দফা দাবিতে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা। বিএনপির তখনকার ভাইস চেয়ারপারসন পদে থাকা খালেদা জিয়াকেও একই পরিণতি বহন করতে হয়। ১৫ ও ৭ দলের অনেক নেতা-কর্মী এ সময় গ্রেপ্তার হন। এই দুই জোট তখন পাঁচ দফা দাবিতে ‘যুগপৎ আন্দোলন’ গড়ে তুলতে থাকে। হরতাল-অবরোধ ছিল তাদের নিয়মিত কর্মসূচি। ১৯৮৫ সালের পয়লা মার্চ সামরিক বিধি পুনর্বহাল ও রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে দুই নেত্রীকে ফের অন্তরীণ করা হয়, যা চলে ২৫ মে পর্যন্ত। খালেদা জিয়া এর এক বছর আগেই (১০ মে, ১৯৮৪) বিএনপির চেয়ারপার্সন পদে নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর এইচ এম এরশাদ সরকারের পতন ঘটানোর জন্য নতুন পর্যায়ের আন্দোলন শুরুর পর দুই নেত্রী ফের গৃহবন্দি। এর আগে ২৮ অক্টোবর ও ৯ নভেম্বর দুই নেত্রী দুই দফা বৈঠক করেন, যা সেনাশাসক এইচ এম এরশাদকে ক্ষমতা হারানোর শঙ্কায় ফেলেছিল। ১৯৮৮ সালের প্রথম দিনে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া ফের বৈঠক করেন। সে সময় ধারণা করা হচ্ছিল যে, এইচ এম এরশাদ সরকারের ওপর থেকে সামরিক বাহিনী সমর্থন প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। কিন্তু অচিরেই তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন। তবে তিনি শঙ্কায় ছিলেন- দুই নেত্রী যে কোনো সময় ফের আন্দোলন তীব্র করে তাকে বিপদে ফেলতে পারে। এ ক্ষেত্রে তিনি শেখ হাসিনাকেই প্রধান বিপদ হিসেবে গণ্য করেন। কারণ রাজপথের আন্দোলনে বরাবরই আওয়ামী লীগ সামনের সারিতে। মিছিল-সমাবেশে এ দলই অগ্রগণ্য। ১৫ অগাস্ট ও ৩ নভেম্বরের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড এবং শত শত নেতা-কর্মীর গ্রেপ্তারের পরও দলটি ফের সংগঠিত হয়ে ওঠে। এ সময় আওয়ামী লীগ আরও একটি কঠিন সমস্যা মোকাবিলা করে- সীমাহীন অপপ্রচার। ‘ভারতের দালাল’- এ অভিযোগ তো ছিলই। ‘বাকশাল গঠন করে একদলীয় শাসন চালু ও সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু’- প্রতিনিয়ত এমন অপবাদের জবাব দিতে দিতে ক্লান্ত হওয়ার অবস্থা। ‘আওয়ামী লীগ ভারতের কাছে স্বাধীনতা বিকিয়ে দিয়েছে এবং জিয়াউর রহমান সেটা ফিরিয়ে এনেছেন’- এমন প্রচারেও বিপর্যস্ত করার চেষ্টা চলে। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে আসে আরও বড় আঘাত। শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে ১৫ দলের সমাবেশ করতে গেলে তার গাড়ি বহরে পুলিশ-বিডিআর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করলে অন্তত ৫ জন নিহত হয়। শেখ হাসিনার প্রতিও গুলি নিক্ষিপ্ত হয়। [এ ভয়ঙ্কর ঘটনার ১৬ বছর পর ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের দলীয় সমাবেশে আরও ভয়ঙ্কর হামলার শিকার হন। ওই সমাবেশে আশপাশের বিভিন্ন ভবন থেকে একের পর এক গ্রেনেড নিক্ষিপ্ত হতে থাকে, যাতে নিহত হন কেন্দ্রীয় নেতা আইভি রহমানসহ অন্তত ২৪ জন। আহতদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের শত শত নেতা-কর্মী। আওয়ামী লীগের গোটা নেতৃত্বসহ শেখ হাসিনা ফের বাঁচেন প্রাণে। এ সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর জোট সরকার। তারেক রহমান ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে এ হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন, এ অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত] ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টের পর আওয়ামী লীগ ২১ বছর ছিল ক্ষমতার বাইরে। সামরিক শাসকরা লোভ-প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জাতীয় পার্টি গঠন করে। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগে ভাঙন ধরানোও ছিল তাদের টার্গেট। এতে সময় সময় সাফল্যও আসে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর গড়ে তোলা এ দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা ছিল শেখ হাসিনার সঙ্গে। এমনকি আশির দশকের মাঝামাঝি আবদুর রাজ্জাকের মতো অনন্য সংগঠক ও প্রভাবশালী নেতা এবং নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি ড.কামাল হোসেনের মতো ব্যক্তিত্বও যথাক্রমে বাকশাল ও গণফোরাম গঠনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে দুর্বল করে ফেলতে পারেননি। শেখ হাসিনা দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর দল পুনর্গঠন ও তৃণমূলে শক্তি বাড়াতে পারেন। একইসঙ্গে তিনি অন্তত চারটি সফল আন্দোলন পরিচালনা করতে পারেন- ১৯৮৪ সালের উপজেলা নির্বাচন বাতিল, ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এইচ এম এরশাদের পতন, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারির প্রহসনের নির্বাচন বাতিল করে খালেদা জিয়াকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য করা এবং ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামের আরেকটি প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের অপচেষ্টা রুখে দেওয়া। ১৯৮৪ ও ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট যুগপৎ আন্দোলন করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে। কিন্তু ১৯৯৬ এবং ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগকে লড়তে হয়েছে কার্যত এককভাবে। এ সময় ধর্মীয় চরমপন্থি অপশক্তির উত্থান ঘটে এবং তারা বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী জোটের পূর্ণ মদদ পায়। সম্প্রতি আমরা হেফাজতে ইসলামীর নামে যে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড দেখেছি, তার পেছনেও ছিল বিএনপির প্রত্যক্ষ সমর্থন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরী আইন জারির পর শেখ হাসিনাকে বন্দি রেখে আওয়ামী লীগ ভাঙার জন্য নানা চক্রান্ত হয়েছে। শেখ হাসিনা জেলের জীবন কাটিয়েছেন রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যৎ সরকারের কর্মসূচি প্রণয়নের কাজে। উন্নত বিশ্বের সারিতে বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়ার রূপকল্প ২০৪১ এবং স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে বাংলাদেশকে পরিণত করার কর্মসূচি ‘ভিশন ২০২১’ নিয়ে তিনি কাজ করেন। আজ যে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বাস্তবে রূপ নিয়েছে, তার খসড়াও এ সময় রচিত। বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে, খাদ্যের ভাণ্ডারে পরিণত করতে হবে বাংলাদেশকে, তথ্য-প্রযুক্তি সবার জন্য বিশেষ করে তরুণ সমাজের জন্য সহজলভ্য করতে হবে, বিশ্বের বুকে গর্বিত বাংলাদেশ নিজের যোগ্য স্থান করে নেবে- কত স্বপ্ন সামনে। একইসঙ্গে তিনি লেখনী চালিয়ে গেছেন এবং প্রকাশের জন্য তৈরি করেছেন বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘আমার দেখা গণচীন’- এর মতো কালজয়ী গ্রন্থ। জরুরী আইন জারির কারণ হিসেবে অভ্যন্তরীণ গোলযোগে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিপন্ন হওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু সবার জানা ছিল, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে জয়ী হওয়ার যে নীলনকশা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান চূড়ান্ত করেছিলেন, সেটা ব্যর্থ করে দিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রবল গণআন্দোলনের মুখেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকার পরিবেশে ‘দলনিরপেক্ষ সরকার’ অচিরেই বিপুল সংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করে। যে কোনও রাজনৈতিক নেতা রাজরোষে পড়ে বন্দি হতে পারেন। ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্যও দণ্ড হতে পারে। দুর্নীতি-স্বজন প্রীতি নেতাদের বিপথগামী করতে পারে। কিন্তু যদি আপনি দেশকে ভালবাসেন, জনগণের মঙ্গল চিন্তায় নিজেকে মগ্ন রাখেন- কখনও হাল ছাড়বেন না। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবেন না। এমনকি কঠিন পরিস্থিতিতেও মুষড়ে পড়বেন না। বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে আমরা এ শিক্ষা পাই। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও একই নজির নেখেছেন। খালেদা জিয়া সবশেষ গ্রেপ্তার হয়েছেন ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। ১১ বছর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও তিনি গ্রেপ্তার হন ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। তারেক রহমান ততদিনে লন্ডনে নির্বাসিত। ‘তারেক রহমান আপাতত রাজনীতি করবেন না’- বলে খালেদা জিয়া প্রকাশ্যেই এ ঘোষণা দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ১১ মাসের বন্দিজীবনকে কাজে লাগিয়েছেন দল ও দেশের কল্যাণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগ সক্রিয় থেকেছে রাজপথে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহম্মদ ইউনূসকে সামনে রেখে ‘নাগরিক শক্তি’ নামে কিংস পার্টি গঠনের চেষ্টা চালায়। বিএনপি নেতা ফেরদৌস কোরেশী ও আওয়ামী লীগ নেতা সাঈদ খোকনসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে চলে আরেকটি সরকার সমর্থক দল গঠনের চেষ্টা। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়। রাজপথ এবং দেশ-বিদেশে নানা ফ্রন্টে সুসংগঠিত তৎপরতা পরিচালনা করে শেখ হাসিনা দলকে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী করতে সক্ষম হন। খালেদা জিয়া তার জামায়াতে ইসলামী ও অন্য ধর্মান্ধ জোট সঙ্গীদের নিয়ে পড়ে যান অনেক পেছনে। রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমে হয়ে পড়তে থাকেন ‘অপ্রয়োজনীয়’। ২০১৩ সালের এপ্রিল ও মে মাসে হেফাজতে ইসলামকে সামনে রেখে বিএনপি নেতারা শেখ হাসিনাকে প্যাচে ফেলতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। রাজনীতির অঙ্গনে ‘আপারহ্যান্ড’ পেয়ে শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে বন্দি করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। দুর্নীতির মামলায় আদালতে খালেদা জিয়া দণ্ডিত হন। বিএনপি বলছে এ মামলা ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন এবং জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নজির’। কিন্তু তারা কার্যকর কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। খালেদা জিয়া দুই দফা পাঁচটি করে জাতীয় সংসদ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন, তিন বার প্রধানমন্ত্রী এবং দুই বার সংসদে বিরোধীদলের নেতা। বিএনপির শীর্ষপদে আছেন প্রায় চার দশক। কিন্তু টানা তিন বছরের বেশি বন্দি থাকলেও দল তাকে মুক্ত করতে পারেনি। কেন ‘আন্দোলন গড়ে তুলতে’ পারছে না বিএনপি? বর্তমান সরকারের ভুলত্রুটি আছে বৈকি। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সমালোচনা হলে প্রতিকারে পদক্ষেপ গ্রহণের নজির কম নেই। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের যারা এমনকি সমালোচনা করেন, তারাও প্রতিকারের জন্য চেয়ে থাকেন শেখ হাসিনার প্রতি। এমন পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে বিএনপির জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে বৈকি।

 

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?