বুধবার, ০৪ আগস্ট ,২০২১

Bangla Version
  
SHARE

শনিবার, ২২ মে, ২০২১, ০৯:৫৪:৩৭

করোনাকালে কৃষি বাজেট

করোনাকালে কৃষি বাজেট

নিতাই চন্দ্র রায়
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বলছে, বিশে^ ৯৬ কোটি মানুষের কাছে বর্তমানে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার মতো পর্যাপ্ত খাবার নেই। তাদের মধ্যে ৬ কোটি ৪০ লাখ মানুষ আরবের ১২টি দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। এসব আরব দেশের প্রতি ছয়জন অধিবাসীর মধ্যে একজন খাদ্য সংকটে রয়েছে। সিরিয়া ও ইয়েমেনে খাদ্য সংকট তীব্র। এসব দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী ক্ষুধার্ত। সিরিয়ার প্রধান খাবার রুটি, ভাত, তেল, চিনি ও ডালের দাম গত ফেব্রুয়ারি মাসে আগের বছরের তুলনায় ২২২ শতাংশ বেড়েছে। ইয়েমেনে জাতিসংঘ দুর্ভিক্ষের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এমনকি আরবের ধনী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরায়ও দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট। বাড়তে থাকা খাদ্যের দামে উদ্বিগ্ন আরব আমিরাত সরকার। মিসরেও খাদ্য সংকট চরমে। সারা বিশ্বে এমনি এক খাদ্য সংকটকালে ২০২১-২২ সালের জাতীয় বাজেট প্রণীত হচ্ছে বাংলাদেশে।

করোনা মহামারীর কারণে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের কৃষিও নানা সমস্যার সম্মুখীন। লকডাউনের কারণে পণ্যপরিবহন ভাড়া বেড়ে গেছে। কমে গেছে পচনশীল কৃষিপণ্যের দাম। ভেঙে গেছে কৃষিপণ্য সরবরাহ চেইন। বিঘ্নিত হচ্ছে বিদেশে কৃষিপণ্য রপ্তানি। কর্ম হারিয়ে অগণিত লোকের আয়-উপার্জন হ্রাস পাওয়ার প্রভাবও পড়েছে কৃষিতে। বিদেশ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ কর্মজীবী দেশে ফেরত এসেছে, যাদের উপার্জিত অর্থে প্রত্যন্ত গ্রামে গড়ে উঠেছে অসংখ্য পোলট্রি-ডেইরি খামার, ফল বাগান, সবজি ও পুকুরে মাছ চাষের মতো নানা কৃষি কর্মকাণ্ড। করোনার কারণে এসব কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

এই করোনার ভয়াবহ দুর্যোগকালে বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে কৃষি এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। মোট জনসংখ্যার শতকরা ৪০ ভাগের বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা এখনো কৃষির সঙ্গে জড়িত। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান শতকরা ১৩.২ ভাগ। গত বছর মহামারী শুরুর দেড় মাসে কৃষি খাতে ক্ষতি হয় ৬৫ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকার ওপর। এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার শতকরা ৪ ভাগ হারে ৫ হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ প্রণোদনা ঘোষণা করলেও ব্যাংকগুলো তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেনি। অথচ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঠিকই শিল্পপতিদের প্রণোদনার ঋণ সময়মতো পরিশোধ করে।

মহামারী করোনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক পর্যায়ে চলে গেলেও বাংলাদেশে ৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে কৃষির বাম্পার ফলনের কারণে। করোনাকালেও কৃষক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশের উর্বর মাটিতে উৎপাদন করেছেন ধান, গম, ভুট্টার মতো দানাশস্য, শাকসবজি ও ফলমূল এবং মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ। গত এক দশকে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ঘটে গেছে এক নীরব বিপ্লব। বর্তমানে বাংলাদেশ চাল ও সবজি উৎপাদনে বিশে^ তৃতীয়। মাছ উৎপাদনে চতুর্থ। আম উৎপাদনে সপ্তম। ফসলের জাত উদ্ভাবনে ও ইলিশ উৎপাদনে প্রথম। ভুট্টা ও আলু উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। আর এসব সম্ভব হয়েছে কৃষির আধুনিকায়নের জন্য।

জনসংখ্যার তুলনায় আমাদের কৃষিজমি অত্যন্ত কম। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, বন্যা, লবণাক্ততা ও নদীভাঙন প্রভৃতি কারণে দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে কৃষিজমি। অন্যদিকে প্রতি বছরই ২২ লাখ করে মানুষ বাড়ছে। এ সমস্যার সমাধানে কৃষিব্যবস্থাকে শতভাগ যান্ত্রিকীকরণ করতে চায় সরকার। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৪০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এ খাতে আগামী বাজেটে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হবে।

সরকার ঘোষিত লকডাউনের কারণে সারা দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে আগামী জুন মাসের ৩ তারিখে আসছে নতুন বাজেট। এবারের বাজেটের আকার হবে ৬ লাখ ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা বেশি। বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অনুমান করা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। আসন্ন বাজেটে কৃষি, খাদ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রায় ৪৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ভর্তুকি ও প্রণোদনা থাকছে। এটি সম্ভাব্য বাজেটের ৮ শতাংশের বেশি। বরাদ্দের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি পাচ্ছে কৃষি খাত। আগামী অর্থবছরে কৃষি খাতে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া খাদ্যে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হতে পারে।

মহামারী করোনায় দেশের মানুষকে সুরক্ষা দিতে কৃষি, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশে প্রণয়ন করা হচ্ছে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট। অতিমারীর মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে, পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তায় নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। ফলে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরই কৃষি উৎপাদনকে তৃতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কৃষি খাতকে।

খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সার, বীজের ভর্তুকি ও প্রয়োজনীয় উপকরণের পাশাপাশি এসব উপকরণ ব্যবহার ও আধুনিক কৃষি সম্পর্কে সম্যক ধারণা বাড়াতে কৃষকের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে বছর জুড়েই। এর জন্য পৃথকভাবে বরাদ্দ রাখা হবে জাতীয় বাজেটে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বাজেট মনিটরিং কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

কৃষি ও কৃষকের টেকসই উন্নয়নে আগামী বাজেট প্রণয়নকালে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

১. কৃষির মূল চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ফসলভিত্তিক ৪% সুদে পর্যাপ্ত কৃষিঋণ দিতে হবে।

২. নিরাপদ খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য রাসায়নিক সারের মতো জৈব সারে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিতে হবে।

৩. কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য কৃষক প্রতিনিধির অংশগ্রহণে জাতীয় কৃষিপণ্যের মূল্য কমিশন গঠন করতে হবে এবং এর মাধ্যমে প্রধান ফসলগুলোর ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দিতে হবে।

৪. জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে কৃষিতে বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা। তাই কৃষক ও কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে অবিলম্বে শস্যবীমা চালু করতে হবে এবং প্রিমিয়ামের একটি অংশ সরকারকে ভর্তুকি হিসেবে দিতে হবে।

৫. বাংলাদেশে ধান উৎপাদনকারী কৃষক প্রতি কেজি ধানে ৬০ পয়সা থেকে ১ টাকা লাভ করলেও মিলমালিকরা সেই ধান থেকে চাল তৈরি করে প্রতি কেজিতে লাভ করেন আড়াই থেকে তিন টাকা। মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরাও সমপরিমাণ লাভ করেন। তাই কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য মজুদের জন্য ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের নামমাত্র সুদে ঋণ দিতে হবে।

৬. অর্থের অভাবে অনেক কৃষক হাইব্রিড বীজ ক্রয় করতে পারেন না। তাই হাইব্রিড বীজ ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহ বাড়ানোর জন্য বীজ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে বীজের মূল্য কৃষকের সাধ্যের মধ্যে রাখতে হবে। এ ব্যাপারে বাজেটে বরাদ্দ থাকা বাঞ্ছনীয়।

৭. ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ছোট ও খণ্ডিত জমিতে ব্যবহার উপযোগী ছোট আকারের কৃষিযন্ত্রের ওপর হাওর অঞ্চলের মতো শতকরা ৭০ ভাগ ভর্তুকি দিতে হবে।

৮. দেশের প্রত্যেক সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এমনকি ইউনিয়ন এলাকায় কৃষক বাজার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৯. উৎপাদন অঞ্চলভিত্তিক কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে হবে এবং বিদেশে কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য বিমান ভাড়া হ্রাস করতে হবে।

১১. ইটভাটা ও তরল বর্জ্য ফেলে যেসব শিল্প-কারখানা কৃষিজমির ক্ষতি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

১২. দেশের প্রায় ৬ কোটি নগরবাসীর খাদ্য, পুষ্টি নিরাপত্তা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিটি নগরে নগরীয় স্থানীয় সরকারের অধীনে পরিকল্পিত-পরিবেশবান্ধব নগরীয় কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

১৩. সহজে ও সুলভে কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য প্রত্যেকটি আন্তঃনগর ট্রেনের সঙ্গে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কৃষিপণ্য পরিবহন ওয়াগনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

১৪. পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা খাতে বাজেট বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ঘাতসহিষ্ণু নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কৃষি গবেষণা জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। তাই কৃষি গবেষণা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। গবেষণা কর্মকাণ্ডে বেসরকারি কৃষি খাত, কৃষক, ভোক্তার এবং রপ্তানি চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

netairoy18@yahoo.com

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?