বুধবার, ০৪ আগস্ট ,২০২১

Bangla Version
  
SHARE

শুক্রবার, ২১ মে, ২০২১, ১১:০৫:৫৬

শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন যে নারীরা

শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন যে নারীরা

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা একটি জাতির ভিত গড়ে তোলে, নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায়। রাঙামাটি পার্বত্য জনপদে কয়েকযুগ ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে গেছেন যে নারীরা, বিশ্ব নারী দিবসে জানাব তাদেরই কয়েকজনের কথা।

রাঙামাটির শিক্ষা অঙ্গনে অঞ্জুলিকা খীসা, বাঞ্চিতা চাকমা ও নিরূপা দেওয়ানের নাম সর্বদা শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়ে আসছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে পার্বত্য জনপদের শিক্ষার ক্ষেত্রে তারা রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

রাঙামাটির সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষিকা অঞ্জুলিকা খীসা। শিক্ষকতার শুরুর দিকের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১৯৭০ সালে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বর্তমান কাঁঠালতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকতার সূচনা। তখন নারী শিক্ষক বলতে আমি একজনই ছিলাম।’

অঞ্জুলিকা খীসা আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার পরে যখন বর্তমান রাণী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলো, সেখানে শর্ত ছিল উচ্চ বিদ্যালয়ে একজন নারী শিক্ষক বাধ্যতামূলক রাখতে হবে। রাঙামাটিতে তখন হাতেগোনা কয়েকজন নারী শিক্ষক ছিলেন। তাই আমাকে ওই স্কুলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।’

এরপর তিনি শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘ ৩৫ বছর। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। ২০০৭ সালে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন এই শিক্ষানুরাগী।

 

অঞ্জুলিকা খীসা— স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নারীদের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে ছুটেছেন বাড়ি বাড়ি

তৎকালীন পার্বত্য জনপদে শিক্ষার পরিবেশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় তখন জনসংখ্যা ছিল খুবই কম। যারা বাস করতেন তাদের মধ্যে শিক্ষা গ্রহণের বিষয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় এই জনপদ ছিল অনেকটাই পিছিয়ে। সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নিতে হলে নারীকে শিক্ষিত হতে হবে, এই ধারণা থেকেই আমরা অনেকে মিলে নারীদের স্কুলমুখী করার উদ্যেগ গ্রহণ করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাহাড়ি গ্রামগুলোর বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে অভিভাবকদের নারী শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে থাকি, উদ্বুদ্ধ করতে থাকি তাদের। এসব কাজ করতে গিয়ে আমাকে অনেক সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু একসময় এসব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলাম। ধীরে ধীরে অভিভাবকরা তাদের মেয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে লাগলেন।’

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অঞ্জুলিকা খীসা বলেন, তখনকার সময়ে প্রতিটি স্কুলে ৩০ শতাংশ নারী শিক্ষক নিয়োগের বাধ্যবাধকতা ছিল। এই নিয়মটি আমি কঠোরভাবে পালনের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু নারী শিক্ষায় পার্বত্য জনপদ পিছিয়ে থাকার কারণে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক পেতাম না। তারপরও একাধিকবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতাম, শুধু নারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার জন্য।’

পাহাড়ে উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা আরেকজন ব্যক্তিত্ব হলেন রাঙামাটি সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বাঞ্চিতা চাকমা। রাঙামাটি জেলায় নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য যিনি এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। ১৯৮৩ সালে বিশেষ বিসিএস পাস করে ১৯৮৪ সালে রাঙামাটি সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি।

নিজের শিক্ষা জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাঞ্চিতা চাকমা বলেন, ‘১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে যখন কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি চলছিল তখন আমি রাঙামাটি সরকারি কলেজের ছাত্রী ছিলাম। নারীদের পড়ালেখা করাটা তখনকার সমাজে ছিল এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। তারপরও আমি আমার মায়ের অনুপ্রেরণায় পড়ালেখাটা চালিয়ে গিয়েছিলাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকতা পেশায় আসার পর আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম পাহাড়ের নারীরা শিক্ষার একটা নির্দিষ্ট পর্যায় থেকে ঝরে যায়। তাদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগটা খুবই কম। তাই আমি তাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলাম। অভিভাবকদের উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগলাম।’

বাঞ্চিতা চাকমা বলেন, ‘শুরুর দিকে আমাকে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু একটা সময় সমাজের ধারণা পাল্টাতে শুরু করল এবং মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বাধাটা অনেকটাই কমে আসতে শুরু করেছিল।’

নারীশিক্ষা, সমাজের সকল ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে যে মানুষটি কাজ করে গেছেন তিনি নিরুপা দেওয়ান। ১৯৭২ সালে তৎকালীন রাঙামাটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি সিনিয়র শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পান। তিনি রাঙামাটির দুই সরকারি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

নিজ শিক্ষাজীবনের কথা বলতে গিয়ে নিরুপা দেওয়ান বলেন, ‘আমাদের ছোটবেলায় নারীদের শিক্ষিত করার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ ছিল না পরিবারগুলোর। কিন্তু আমার মা শিক্ষক হওয়ার কারণে তিনি আমাদের শিক্ষার ব্যাপারে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছেন। তখনকার পাহাড়ি পরিবারের পুরুষরাই পড়ালেখা করত না, তাই তারা নারীদের শিক্ষার ব্যাপারেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করত।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ তৈরির ফলে বিপুলসংখ্যক পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ভূমিহীন হয়ে পড়েন। তখন তারা ধীরে ধীরে শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে থাকেন।’

dhakapost সমাজের সব ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণে কাজ করে গেছেন নিরুপা দেওয়ান

তিনি বলেন, ‘শিক্ষক হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করার পরপরই পাহাড়ের পিছিয়ে থাকা নারী শিক্ষা আমাকে যথেষ্ট ভাবিয়ে তুলেছিল। যেহেতু একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ দরকার, তাই আমি এই পিছিয়ে থাকা নারীদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করতে থাকি।’

শিক্ষানুরাগী নিরুপা দেওয়ান বলেন, ‘নারীশিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করাতে গিয়ে আমাকে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কারণ পরিবারের পুরুষরা কখনোই চাইতো না, নারীরা বাড়ির বাইরে যাক। তারপরও এসব বাধা কাটিয়ে আমরা একসময় নারীদের স্কুলমুখী করতে পেরেছিলাম। যার প্রতিফলন আজকের সমাজে দেখা যাচ্ছে।’

৩৮ বছরের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন শেষে ২০১০ সালে অবসর গ্রহণ করেন তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

  বায়িং হাউসের নামে মাদকের ল্যাব, উচ্চবিত্ত তরুণ-তরুণীদের আনাগোনা

  ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে লাগবে সাড়ে ৩ ঘণ্টা!

  শান্তিরক্ষা মিশনে নিহত ৮ বাংলাদেশিকে সম্মান জানালো জাতিসংঘ

  ব্রিটেনের ৮০০ বছরের ইতিহাস ভাঙলেন বাংলাদেশি হাবিবুর

  ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ লেখা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বেদনাদায়ক: ফিলিস্তিন রাষ্ট্রদূত

  বাংলাদেশিদের ইসরায়েল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা বহাল

  নিখোঁজ ঢাবি শিক্ষার্থী হাফিজুরের লাশ মিলল শহিদ মিনারের পেছনে

  ছেলের সামনে বাবাকে হত্যা: আরেক আসামি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত

  ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আতঙ্কিত নয়, সাবধান হোন

  সাংবাদিক রোজিনার জামিন শুনানির আদেশ আজ

  একটি মেসেজ শেয়ার করলেই হ্যাকের আশঙ্কা, পুলিশের সতর্কতা

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?