হিস্টেরোস্কোপি: জরায়ুর অভ্যন্তরীণ সমস্যা নির্ণয় ও চিকিৎসায় আধুনিক পদ্ধতি
ডা. শ্রাবণী চক্রবর্তী:-- নারীর প্রজননস্বাস্থ্যের সঙ্গে জরায়ুর সুস্থতা গভীরভাবে সম্পর্কিত। মাসিকের অনিয়ম, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাত কিংবা গর্ভধারণে সমস্যার পেছনে জরায়ুর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এসব সমস্যার সঠিক কারণ নির্ণয় করা চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আধুনিক গাইনিকোলজিতে হিস্টেরোস্কোপি এমন একটি কার্যকর পদ্ধতি, যার মাধ্যমে জরায়ুর ভেতরের অংশ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী একই সময়ে নির্দিষ্ট কিছু সমস্যার চিকিৎসাও করা সম্ভব।
হিস্টেরোস্কোপি কী?
হিস্টেরোস্কোপি হলো একটি বিশেষ চিকিৎসাপদ্ধতি, যার মাধ্যমে হিস্টেরোস্কোপ নামের সরু, আলোকযুক্ত ক্যামেরাযুক্ত যন্ত্র যোনিপথ ও জরায়ুমুখ দিয়ে জরায়ুর ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। এর সাহায্যে জরায়ুর অভ্যন্তরীণ আবরণ ও গহ্বর সরাসরি দেখা যায়। সাধারণত পেটে কোনো কাটা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
হিস্টেরোস্কোপি প্রধানত দুই ধরনের উদ্দেশ্যে করা হয়—রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা। রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে জরায়ুর ভেতরে রক্তক্ষরণের সম্ভাব্য কারণ, পলিপ, কিছু ধরনের ফাইব্রয়েড বা অন্যান্য অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে এটি সহায়তা করে। চিকিৎসামূলক হিস্টেরোস্কোপির মাধ্যমে নির্বাচিত ক্ষেত্রে পলিপ অপসারণ, জরায়ুর গহ্বরের ভেতরে থাকা উপযুক্ত ফাইব্রয়েড অপসারণ কিংবা কিছু নির্দিষ্ট গঠনগত সমস্যার চিকিৎসা করা যেতে পারে।
কখন হিস্টেরোস্কোপি প্রয়োজন হতে পারে?
কিছু উপসর্গের কারণ নির্ণয় বা চিকিৎসার পরিকল্পনা তৈরির জন্য চিকিৎসক হিস্টেরোস্কোপি করার পরামর্শ দিতে পারেন। যেমন—
• অতিরিক্ত বা দীর্ঘস্থায়ী মাসিক রক্তক্ষরণ।
• মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে অস্বাভাবিক রক্তপাত।
• মেনোপজের পর রক্তপাত।
• জরায়ুর ভেতরে পলিপ বা নির্দিষ্ট ধরনের ফাইব্রয়েড থাকার সন্দেহ।
• আল্ট্রাসনোগ্রামে জরায়ুর গহ্বরে অস্বাভাবিকতা দেখা যাওয়া।
• নির্বাচিত ক্ষেত্রে গর্ভধারণে সমস্যা বা বারবার গর্ভপাতের সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধান।
তবে এসব উপসর্গের সব ক্ষেত্রেই হিস্টেরোস্কোপি প্রয়োজন হয় না। রোগীর বয়স, উপসর্গ, চিকিৎসার ইতিহাস, অন্যান্য পরীক্ষার ফলাফল এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হয়।
হিস্টেরোস্কোপির মাধ্যমে কী কী সমস্যা শনাক্ত বা চিকিৎসা করা যায়?
জরায়ুর গহ্বরের ভেতরে থাকা কিছু অস্বাভাবিকতা সাধারণ আল্ট্রাসনোগ্রামে সন্দেহ করা গেলেও হিস্টেরোস্কোপির মাধ্যমে সেগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক পলিপ বা উপযুক্ত অবস্থানে থাকা কিছু ফাইব্রয়েড অপসারণ করতে পারেন। জরায়ুর ভেতরে আঠালো টিস্যু তৈরি হলে নির্বাচিত ক্ষেত্রে তা চিকিৎসার সুযোগও থাকতে পারে।
কোনো অস্বাভাবিক টিস্যু পরীক্ষা করার প্রয়োজন হলে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হতে পারে। বিশেষ করে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণের কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজন অনুযায়ী টিস্যু পরীক্ষার গুরুত্ব রয়েছে।
এখানে মনে রাখা জরুরি, হিস্টেরোস্কোপি জরায়ুর গহ্বরের ভেতরের সমস্যা মূল্যায়নে বিশেষভাবে কার্যকর। জরায়ুর বাইরের অংশ, ডিম্বাশয় বা অন্যান্য পেলভিক সমস্যার মূল্যায়নের জন্য আলাদা পরীক্ষা কিংবা চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
ডে-কেয়ার হিস্টেরোস্কোপি: একই দিনে বাড়ি ফেরার সুযোগ
অনেক ক্ষেত্রে হিস্টেরোস্কোপি ডে-কেয়ার পদ্ধতিতে করা সম্ভব। অর্থাৎ, রোগীর অবস্থা ও চিকিৎসার ধরন উপযুক্ত হলে হাসপাতালে দীর্ঘ সময় ভর্তি থাকার প্রয়োজন নাও হতে পারে এবং পর্যবেক্ষণ শেষে একই দিনে বাড়ি ফেরার সুযোগ থাকে।
তবে সব হিস্টেরোস্কোপি একই ধরনের নয়। কিছু পরীক্ষা কোনো ধরনের অবশকরণ ছাড়াই করা সম্ভব, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় অবশকরণ, সেডেশন বা জেনারেল অ্যানেস্থেশিয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কোন পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা হবে, তা নির্ভর করে প্রক্রিয়ার জটিলতা, রোগীর স্বাচ্ছন্দ্য, শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর।
ডে-কেয়ার পদ্ধতি মানেই যে প্রত্যেক রোগী একই দিনে বাড়ি ফিরতে পারবেন, তা নয়। চিকিৎসার পর রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
হিস্টেরোস্কোপির আগে কী প্রস্তুতি প্রয়োজন?
হিস্টেরোস্কোপির আগে চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, মাসিকের ইতিহাস, পূর্ববর্তী চিকিৎসা এবং চলমান ওষুধ সম্পর্কে জানতে চাইতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী আল্ট্রাসনোগ্রাম, রক্ত পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে।
রোগী গর্ভবতী কি না, কোনো সংক্রমণ রয়েছে কি না এবং রক্তপাতের কারণ কী—এসব বিষয়ও চিকিৎসা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ। সেডেশন বা জেনারেল অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে খাবার গ্রহণ বন্ধ রাখা এবং অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পর্কে হাসপাতালের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
রক্ত পাতলা করার ওষুধসহ নিয়মিত কোনো ওষুধ গ্রহণ করলে চিকিৎসককে জানানো জরুরি। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া নিজে থেকে কোনো ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
হিস্টেরোস্কোপির সুবিধা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
হিস্টেরোস্কোপির অন্যতম সুবিধা হলো জরায়ুর ভেতরের অংশ সরাসরি দেখা যায়। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু সমস্যার কারণ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী একই প্রক্রিয়ায় চিকিৎসা করা সম্ভব হতে পারে। পেটের কাটা ছাড়াই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সুস্থ হয়ে ওঠার সময়ও তুলনামূলক কম হতে পারে।
তবে এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। প্রক্রিয়ার পর সাময়িক ব্যথা, মাসিকের মতো মৃদু রক্তপাত বা অস্বস্তি হতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে সংক্রমণ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, জরায়ুর দেয়ালে আঘাত কিংবা ব্যবহৃত তরলের কারণে জটিলতা দেখা দিতে পারে। ঝুঁকি প্রক্রিয়ার ধরন এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
হিস্টেরোস্কোপির পর তীব্র বা ক্রমবর্ধমান পেটব্যথা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, জ্বর, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব কিংবা শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
নারীর প্রজননস্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতনতা জরুরি
মাসিকের অস্বাভাবিকতা বা দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণকে অবহেলা করা উচিত নয়। এসব উপসর্গের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যার মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ নির্ণয় গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা এবং উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা সহজ হয়।
হিস্টেরোস্কোপি জরায়ুর অভ্যন্তরীণ সমস্যা নির্ণয় ও নির্বাচিত ক্ষেত্রে চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। তবে সবার জন্য একই চিকিৎসা উপযুক্ত নয়। রোগীর উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা, ভবিষ্যৎ প্রজনন পরিকল্পনা এবং পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা উচিত।
নারীর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নিজের শরীরের পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা, অস্বাভাবিক উপসর্গকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: ডা. শ্রাবণী চক্রবর্তী
সিনিয়র কনসালট্যান্ট
অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনোকোলজি
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম।
পরামর্শ ও অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম
অ্যাপয়েন্টমেন্ট: ১০৬৬৩
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com