ডেস্ক রির্পোট:- সবুজ পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালেও লুকিয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের নীরব কান্না। দুর্গম পথ, সীমিত কর্মসংস্থান, জুম চাষের অনিশ্চিত আয় আর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাড়তি খরচ—সব মিলিয়ে বান্দরবানের আলীকদম ও সদর উপজেলার অনেক পরিবার প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীদের জুমচাষ ছাড়া আয়ের আর কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে।
সংসারে অভাব, সন্তানের পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাঁদের নিত্যসঙ্গী। এমন বাস্তবতায় অসচ্ছল নারীদের স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন নিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে এই দুই উপজেলার ৪০ জন অসচ্ছল নারীকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন প্রদান করা হয়েছে। সম্প্রতি আলীকদম ও সদর উপজেলা হলরুমে জীবনযুদ্ধের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই নারীদের হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেন অতিথিরা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, বান্দরবান সদর থানার ওসি মো. শাহেদ পারভেজ, বান্দরবান জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল হক বাচ্চু, বসুন্ধরা শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, আলীকদম উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. রিটন, আলীকদম থানার সাব-ইন্সপেক্টর ইয়ামিন আহমেদ, বসুন্ধরা শুভসংঘ আলীকদম উপজেলা শাখার উপদেষ্টা ইয়ংলক ম্রো, নুরসাদা ভূইয়া বাবু, চ্যানেল আইয়ের বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি ইসমাইল হাসান, নিউজ টোয়েন্টিফোরের জেলা প্রতিনিধি এস এম সম্রাট, কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি জহির রায়হান, মাল্টিমিডিয়া প্রতিনিধি রিমন পালিত, শিক্ষিকা এচিংনু মার্মা, বসুন্ধরা শুভসংঘ বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি উয়ই সিং মার্মা, কালের কণ্ঠ আলীকদম উপজেলার মাল্টিমিডিয়া প্রতিনিধি সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা, বসুন্ধরা শুভসংঘ আলীকদম উপজেলা শাখার সভাপতি এস এম জিয়াউদ্দিন জুয়েল, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রানা, রোয়াংছড়ির সভাপতি শিমুল তঞ্চঙ্গ্যা প্রমুখ।
আয়োজকরা জানান, সীমিত আয়ের পরিবার, কর্মসংস্থানের অভাব এবং সংসারের নানা দায়িত্বের কারণে অনেক নারী নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এমন বাস্তবতায় নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি ও স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বসুন্ধরা শুভসংঘের উদ্যোগে এই সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। এর আগে এসব নারীকে বিনা মূল্যে তিন মাসব্যাপী সেলাই প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন পাওয়ায় নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে তাঁদের সামনে। সেলাই মেশিন পাওয়া নারীদের একজন মাসিংচিং মার্মা। বান্দরবান সদরের রেনীং পাড়ার বাসিন্দা মাসিংচিং লোটাস শিশু সদন আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা থোয়াইচিংনু মার্মা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি হিসেবে কর্মরত। দুই বোনের পরিবারে সীমিত আয়ের মধ্যেই তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ শিখে ভবিষ্যতে নিজের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে মাসিংচিং। প্রশিক্ষণের পর পাওয়া সেলাই মেশিনটি তার সেই স্বপ্নপূরণের পথে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হবে বলে মনে করে সে। আরেক উপকারভোগী মেসাইনু মার্মা বান্দরবান সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা সাবাই উ মার্মা কৃষিকাজ করে সংসার চালান। মেসাইনুর মা মারা গেছেন অনেক আগে। বাবার সীমিত আয়ের ওপর নির্ভর করেই তাঁর পড়াশোনা এগিয়ে চলছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন পাওয়াকে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করে আয় করার মাধ্যমে পরিবারের আর্থিক সংকটে সহযোগিতা করতে চান মেসাইনু।
এই ৪০ জনের একজন শ্যামলী তঞ্চঙ্গ্যা বান্দরবান সরকারি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বাবা কদম তঞ্চঙ্গ্যা তেমন আয় করতে পারেন না। পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই নাজুক যে এনজিওতে চাকরি করা ভাইয়ের আয়ে কোনোমতে সংসার চলে। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন শ্যামলী। তাঁর বিশ্বাস, সেলাইয়ের কাজ করে নিজের আয়ে সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারবেন। উপকারভোগীদের আরেকজন চামমুম ম্রো আলীকদম কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বাবা রেংকাই ম্রো জুম চাষ করে তিন ছেলে ও আট মেয়ের বিশাল সংসার চালান। ফসল ভালো হলে দুবেলা খাবার জোটে, আর খারাপ মৌসুমে বাড়ে দুশ্চিন্তা। এমন কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে চামমুম। বসুন্ধরা গ্রুপের উপহার হিসেবে পাওয়া সেলাই মেশিনকে পরিবারের ভাগ্যবদলের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে সে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, ‘বসুন্ধরা শুভসংঘের সেলাই মেশিন বিতরণ কার্যক্রম অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে সেলাই প্রশিক্ষণ ও মেশিন প্রদান নিঃসন্দেহে মানবিক কাজ। এই উদ্যোগ নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে।’
সদর থানার ওসি মো. শাহেদ পারভেজ বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে বিনা মূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ ও মেশিন বিতরণ করায় বসুন্ধরা গ্রুপকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আশা করি, তাদের এই মহৎ উদ্যোগ সমাজের নারীদের আত্মনির্ভরশীল হতে সহায়তা করবে এবং তাঁদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
বান্দরবান জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল হক বাচ্চু বলেন, ‘শুধু সেলাই মেশিন বিতরণ নয়, বসুন্ধরা শুভসংঘ এর আগে তিন মাসের বিনা মূল্যের প্রশিক্ষণ দেওয়ায় উপকারভোগীরা দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন। ফলে মেশিনগুলো তাঁদের জন্য শুধু একটি সহায়তা নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।’
বসুন্ধরা শুভসংঘ বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি উয়ই সিং মার্মা বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের অনেক নারী নানা সীমাবদ্ধতার কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান না। তাঁদের দক্ষ করে গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বসুন্ধরা শুভসংঘের এই উদ্যোগ নারীদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে।’
সেলাই মেশিন পাওয়া ৪০ জন নারীর বেশির ভাগই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের এই নারীদের অনেকে শিক্ষার্থী। সেলাই মেশিন পেয়ে তারা বলে, এই মেশিনই হবে আমাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সহায়ক শক্তি। বসুন্ধরা গ্রুপ ও শুভসংঘ আমাদের স্বপ্নপূরণের সহযোগী হয়েছে। আমরা অনেক অনেক কৃতজ্ঞ।
স্থানীয় লোকজন জানায়, পার্বত্য অঞ্চলে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ এখনো খুব সীমিত। এমন উদ্যোগ শুধু কয়েকটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে না, বরং অনেক নারীকে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সাহসও জোগাবে। বসুন্ধরা গ্রুপের এই মানবিক উদ্যোগ পাহাড়ে নতুন আশার বার্তা হয়ে এসেছে।
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com