মো. রেজুয়ান খান:- বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত নৈসর্গিক রূপসী ভূখণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রাম। পাহাড়, নদী, নিঝুম উপত্যকা আর ঘন অরণ্যে ঘেরা এ অঞ্চলটি কেবল তার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই অনন্য নয়, বরং বহুজাতি, বহুভাষা ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ নানা নৃগোষ্ঠীর মানুষ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে এই পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে আসছে।শিক্ষা উপকরণ খোঁজা
ভৌগোলিক দুর্গমতা, ঐতিহাসিক সামাজিক সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘকালের রাজনৈতিক জটিলতার কারণে জাতীয় উন্নয়নের মূলস্রোতধারা থেকে পার্বত্য অঞ্চল দীর্ঘদিন কিছুটা বিচ্ছিন্ন ও দূরে অবস্থান করছিল। এর প্রত্যক্ষ ও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল এই অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। বিদ্যালয়ের অভাব, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, আধুনিক শিক্ষা উপকরণের অপ্রতুলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির কারণে সমতলের চেয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বিরাট ব্যবধান তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু সময় বদলেছে। একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য দেশের প্রতিটি নাগরিককে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা অপরিহার্য। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের ভাগ্যোন্নয়ন এবং সমতলের সঙ্গে শিক্ষার ঐতিহাসিক বৈষম্য দূরীকরণে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করেছে। বিশেষত, পাহাড়ের সন্তানদের আধুনিক, কারিগরি, প্রযুক্তিনির্ভর ও উন্নত শিক্ষায় আলোকিত করাকে সরকারের প্রধানতম অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকারের এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয় জেলা প্রশাসন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং নানা সামাজিক ও বেসরকারি সংগঠনের এক অভূতপূর্ব সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই অঞ্চলে শিক্ষার আমূল রূপান্তর ঘটানো হচ্ছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে মাঠপর্যায় পর্যন্ত এই সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক নতুন, গতিশীল ও প্রশংসনীয় রূপ পরিগ্রহ করছে।ম্যাপ রেফারেন্স দেখা
বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার শিক্ষাকে কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে আধুনিক, যুগোপযোগী ও আনন্দময় করতে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম’ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চালু করার পদক্ষেপ নিয়েছে। গতানুগতিক ব্ল্যাকবোর্ড ও মুখস্থবিদ্যার একঘেয়েমি কাটিয়ে পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা এখন ডিজিটাল স্ক্রিনে ভিজ্যুয়াল কনটেন্টের মাধ্যমে পাঠ গ্রহণ করতে পারছে-এটি আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। বিজ্ঞান, গণিত ও ভূগোলের মতো জটিল বিষয়গুলোকে রঙিন অ্যানিমেশন, তথ্যবহুল শিক্ষণীয় ভিডিও এবং ইন্টারঅ্যাক্টিভ কুইজের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে ছোট ছোট শিশুদের বিদ্যালয়মুখিতা ও উপস্থিতির হার বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৌতূহল ও উদ্দীপনার সঙ্গে শেখার এই আধুনিক সংস্কৃতি শিশুদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শিক্ষায় বৈশ্বিক মান নিশ্চিতকরণের অংশ হিসেবে খাগড়াছড়িতে আন্তর্জাতিক মানের ইংরেজি কারিকুলামের স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাহাড়ি দূরবর্তী এলাকার শিশুরাও আন্তর্জাতিক স্তরের গুণগত শিক্ষার সুফল লাভ করছে। এটি তাদের ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সমকক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করছে।সিটি গাইড এক্সপ্লোর
উচ্চ পাহাড়ি পথ, আঁকাবাঁকা গিরিপথ এবং বর্ষার খাদ-খন্দ পেরিয়ে দূর-দূরান্তের স্কুলে প্রতিদিন যাতায়াত করা পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রতিকূল আবহাওয়ায় পথচলা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি দূরত্বের কারণে অনেক শিশুই মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিত।
সরকার এই ভৌগোলিক বাধা দূরীকরণে অবকাঠামোগত উন্নয়নে অভাবনীয় পরিবর্তন এনেছে। পাহাড়ের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাগুলোতে তৈরি করা হচ্ছে সুপরিসর ও আধুনিক বিদ্যালয় ভবন। প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে আধুনিক টয়লেট এবং বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির টেকসই ব্যবস্থা করা হয়েছে। দূরবর্তী পরিবারের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের কষ্ট ও ঝুঁকি লাঘব করতে ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা, নিরাপদ ও আধুনিক আবাসন ব্যবস্থা (হোস্টেল) গড়ে তোলা হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বহুভাষিক ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর শিশুদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ভাষার অধিকারকে শ্রদ্ধার সঙ্গে বিবেচনা করে সরকার তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করেছে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য নিজ নিজ ভাষার বর্ণমালা ও মাতৃভাষায় রচিত পাঠ্যবই বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে।নতুন শখ খোঁজা
যে শিশুরা পূর্বে অপরিচিত ভাষার কারণে শ্রেণিকক্ষে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করত, তারা এখন নিজ মাতৃভাষায় প্রথম বর্ণমালা শিখতে পারছে এবং বইয়ের গল্প পড়ছে। এটি শিশুদের পাঠগ্রহণের প্রক্রিয়াকে কেবল সহজই করেনি, বরং তাদের মনে আত্মবিশ্বাস ও নিজ সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ সৃষ্টি করেছে। নিজের মাতৃভাষায় শিক্ষার এই সুযোগ পাহাড়ি শিশুদের জন্য শিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, সার্বজনীন ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলেছে।
পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক গঠন অত্যন্ত জটিল। অনেক দূরবর্তী গ্রাম বা পাড়া এখনও সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে। তবে এই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা যেন শিক্ষার আলোর পথে বাধা হতে না পারে, সে জন্য সরকার স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে ই-লার্নিং ব্যবস্থা চালুর ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। স্যাটেলাইট সংযোগের সাহায্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ক্লাস এখন পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সরাসরি অনলাইনে উপভোগ করতে পারছে।
পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুৎ সমস্যার টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে বিদ্যালয় ও হোস্টেলগুলোতে সোলার প্যানেল বসানো হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের হাতে ল্যাপটপ, ট্যাবলেট ও আধুনিক গ্যাজেট পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। শিক্ষামূলক গেমস, ডিজিটাল কুইজ ও ভিজ্যুয়াল কনটেন্টের মাধ্যমে শেখার ফলে পাহাড়ি শিশুদের মাঝে প্রযুক্তিবান্ধব সংস্কৃতি গড়ে উঠছে।এশিয়ান পণ্য সংগ্রহ
শুধু তাত্ত্বিক সনদনির্ভর শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে পাহাড়ের তরুণ প্রজন্মকে আত্মনির্ভরশীল ও কর্মক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক চাহিদা বিবেচনায় রেখে বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক কৃষি, তাঁতশিল্প, পর্যটন, আইসিটি ও ফ্রিল্যান্সিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
এছাড়া পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সেলাই, ফুড প্রসেসিং ও আইটি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তিন পার্বত্য জেলায় পলিটেকনিক ও ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের কাজও এগিয়ে চলছে।
পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিদ্যালয়গুলোতে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের মাধ্যমে নিয়মিত মানসিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে, যা তাদের আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে সহায়তা করছে।
নিঃসন্দেহে একটি দীর্ঘদিনের অনগ্রসর অঞ্চলকে রাতারাতি পুরোপুরি বদলে ফেলা সম্ভব নয়; এখনও কিছু কাঠামোগত ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ একযোগে কাজ করছে।এশীয় সংস্কৃতি জানা
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), ইউএনডিপি (UNDP), ইউনিসেফ (UNICEF), ব্র্যাক (BRAC) এবং সেভ দ্য চিলড্রেন (Save the Children)-এর মতো সংস্থাসমূহ এই শিক্ষাযাত্রাকে আরও বেগবান করছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষায় এই গুণগত পরিবর্তন কেবল পাঠ্যবই বা পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির এক দৃঢ় ভিত্তি। শিক্ষার আলো যখন পাহাড়ি ঘরে ঘরে পৌঁছাচ্ছে, তখন অন্ধকার ও অনগ্রসরতা দূর হওয়া সময়ের ব্যাপার।
লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়
পিআইডি ফিচার
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com