শামসুল আলম:- রাঙ্গামাটির কাপ্তাই লেকের প্রকৃত সীমানা নির্ধারণে জরিপ করে লেকের ভেতরে থাকা অবৈধ দখলদার ও অবৈধ স্থাপনার মালিকদের নাম-ঠিকানাসহ তালিকা আদালতে দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী চার মাসের মধ্যে এ জরিপ শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক সম্পূরক আবেদনের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। আদালত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৬ জানুয়ারি ২০২৭ তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, কাপ্তাই লেকের প্রকৃত ম্যাপ অনুসরণ করে সীমানা জরিপ করতে হবে। এ কাজে রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জরিপের মাধ্যমে লেকের সীমানার মধ্যে থাকা অবৈধ দখল ও স্থাপনা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম-ঠিকানাসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে।

২০২২ সালের রিট থেকে নতুন নির্দেশ
কাপ্তাই লেকের বিভিন্ন অংশ অবৈধভাবে দখল, মাটি ভরাট ও দূষণের অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর জনস্বার্থে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) হাইকোর্টে রিট করে। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
এরপর লেকের প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ এবং অবৈধ দখলদারদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এ বিষয়ে এইচআরপিবির পক্ষ থেকে সম্পূরক আবেদন করা হলে এবার আদালত জরিপ ও তালিকা তৈরির সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেন।

কেন জরিপ গুরুত্বপূর্ণ?
কাপ্তাই লেকের বিভিন্ন এলাকায় দখল করে বসতি, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে কোন অংশ প্রকৃতপক্ষে লেকের সীমানার মধ্যে এবং কোনটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি—এ নিয়ে জটিলতা রয়েছে।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক দখলদার বর্তমানে সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানা দাবি করছেন। ফলে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে প্রশাসনকে জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। প্রকৃত ম্যাপ অনুযায়ী জরিপ হলে লেকের সীমানা স্পষ্ট হবে এবং কারা অবৈধভাবে দখল করে আছেন, তা শনাক্ত করা সহজ হবে।
আগেও হয়েছিল দখলদারদের তালিকা
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কাপ্তাই লেকের অবৈধ দখলদারদের একটি তালিকা তৈরি করেছিল। ওই তালিকায় রাঙ্গামাটি পৌর এলাকার ২২ জন এবং কাপ্তাই উপজেলার ৮ জনের নাম ছিল। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম ওই তালিকায় ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে নতুন করে প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির হাইকোর্টের নির্দেশকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কাপ্তাই লেকের গুরুত্ব
কাপ্তাই লেক শুধু রাঙ্গামাটির নয়, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলসম্পদ। কর্ণফুলী নদীতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাঁধ নির্মাণের পর এ লেকের সৃষ্টি হয়। লেকটি রাঙ্গামাটি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ছাড়াও খাগড়াছড়ির মহালছড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর আয়তন প্রায় ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর।
এই বিশাল জলভাণ্ডার ঘিরে স্থানীয় মানুষের জীবিকা, মৎস্যসম্পদ, নৌযোগাযোগ, পর্যটন এবং কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কার্যক্রম প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

দখল বন্ধে এবার কতটা কার্যকর হবে?
হাইকোর্টের নতুন নির্দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এবার শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, প্রকৃত সরকারি ম্যাপ ও মাঠ জরিপের মাধ্যমে লেকের সীমানা নির্ধারণ করা হবে। এরপর সেই সীমানার ভেতরে থাকা অবৈধ স্থাপনা ও দখলদারদের নাম-ঠিকানা আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।
এর ফলে দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব নিয়ে যে অস্পষ্টতা রয়েছে, তা অনেকটাই দূর হতে পারে। একই সঙ্গে তালিকা প্রকাশের পর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, দখলমুক্তকরণ এবং ভবিষ্যতে নতুন করে লেক দখল ঠেকাতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে শুধু তালিকা তৈরি করলেই কাপ্তাই লেক রক্ষা সম্ভব নয়। তালিকার ভিত্তিতে কার্যকর উচ্ছেদ, দখল বন্ধ, নতুন স্থাপনা নির্মাণে কঠোরতা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করাও জরুরি।
হাইকোর্টের এই নির্দেশ তাই কাপ্তাই লেক রক্ষার দীর্ঘদিনের দাবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে—চার মাসের মধ্যে জরিপ কতটা নিরপেক্ষ ও সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় এবং আগামী ৬ জানুয়ারি ২০২৭ আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে প্রকৃত চিত্র কতটা উঠে আসে।
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com