ডেস্ক রির্পোট:- দীর্ঘদিন ধরে দেশে গ্যাস সংকট চলছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। চাহিদার মাত্র ৫৬ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা। গ্যাস সংকটের কারণে ধুঁকছে শিল্প খাত।
দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও চাপ অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেল, এলপিজি ব্যবহার করে কারখানা চালু রাখা হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় দাঁড়াচ্ছে কয়েক গুণ। উদ্যোক্তারা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন কমানোর পাশাপাশি অনেক কারখানা বন্ধ করে দিতে হতে পারে। বিশেষ করে অনেক ছোট কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বিকল্প উপায়ে জ্বালানি সংগ্রহ করতে না পারায়।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপরেও। রাজধানী থেকে জেলা শহর; সবখানেই গ্যাসের ঘাটতিতে ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি, অন্যটি সামিট গ্রুপ। গত সপ্তাহে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুনের পর সৃষ্ট যান্ত্রিক ত্রুটিতে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে এলএনজি থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলেও বর্তমানে তা ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছে, যা আগে ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। অথচ দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা জানান, তাদের দৈনিক প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে আগে পাওয়া যাচ্ছিল প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুটে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্পাঞ্চল, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাস সংকট চরমে পৌঁছেছে। সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস এনে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার যে বিকল্প ব্যবস্থা ছিল, সেটিও এখন অচল। ফলে ডায়িং, ফিনিশিং ও আয়রনের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং ক্রেতারা ক্রয়াদেশ স্থগিত, বাতিল বা মূল্য কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানান, তীব্র গ্যাস সংকটসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে দেশের ১২১টি স্পিনিং মিল উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
গাজীপুরে সবচেয়ে বেশি সংকট
দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কোনাবাড়ী, মৌচাক, চন্দ্রা, টঙ্গী, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও বোর্ডবাজার এলাকার অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় ১০ থেকে ১৫ পিএসআই/ গ্যাস চাপের বিপরীতে মিলছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। কোথাও আবার চাপ একেবারে শূন্যে নেমে যাচ্ছে। এতে অন্তত অর্ধশত ছোট ও মাঝারি কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে।
গোমতী টেক্সটাইল কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুর রহমান আনিস বলেন, লাইনে কার্যত কোনো গ্যাস নেই। কয়েক দিন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে।
সাদমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল রানা বলেন, কারখানা চালাতে ন্যূনতম ৪ পিএসআই গ্যাস চাপ দরকার। কিন্তু অনেক সময় ১ পিএসআইও পাওয়া যায় না। উৎপাদন বন্ধ করা ছাড়া উপায় নেই। তিনি বলেন, তাঁর কারখানায় ৭ হাজার শ্রমিক রয়েছেন। এখন তারা অলস সময় পার করছেন। আমবাগ এলাকার তাপস পিন কারখানার দৃশ্য একই। ২ হাজার ৭০ শ্রমিকের এ কারখানাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কোনাবাড়ীর তুসুকা গ্রুপ ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক তারেক হাসান বলেন, প্রতিদিন শুধু ডিজেল কিনতেই অতিরিক্ত প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এভাবে বেশি দিন উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
তিতাস গ্যাস গাজীপুর জোনের ব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. গোলাম ফারুক সমকালকে বলেন, জেলা ও মহানগরে দৈনিক প্রায় ৫৯ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে ৩০ কোটি ঘনফুট।
সাভার-আশুলিয়ায় রপ্তানি খাত চাপে
ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোও গ্যাস সংকটে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কোথাও সকালে গ্যাস থাকলে দুপুরের পর চাপ কমে যাচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আশুলিয়ার লুসাকা নামে এক কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মেজর (অব.) মনিরুজ্জামান বলেন, ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা দাম বাড়াচ্ছেন না। তিনি জানান, সাভার-আশুলিয়া এলাকায় ইতোমধ্যে ৫২টির মতো কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
ভালুকায় বাড়ছে উদ্বেগ
ময়মনসিংহের ভালুকায় এখনও গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে দিনের মধ্যে কয়েক দফা গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং কিছু সময়ের জন্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন শিল্প উদ্যোক্তারা।
শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজের মহাব্যবস্থাপক মোকলেসুর রহমান বলেন, উৎপাদন ব্যয় এমনিতেই বেড়ে গেছে। এর মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ধরে রাখতে পারবে না। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
নোমান কম্পোজিট অ্যান্ড টেক্সটাইল মিলসের সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক রেদোয়ান আহাম্মেদ বলেন, দিনে পাইপলাইনে গ্যাস একেবারে শূন্য হয়ে যায়। ডিবিএল গ্রুপের গ্লোরি টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলস ইন্ডাস্ট্রিজের মহাব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, মাঝেমধ্যে গ্যাসের চাপ একেবারে শূন্যে নেমে যাচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে বিকল্প পথও বন্ধ
নারায়ণগঞ্জের ডাইং শিল্পেও সংকট তীব্র হয়েছে। লাইনে গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানা এতদিন সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস এনে উৎপাদন চালাচ্ছিল। কিন্তু তিতাসের নির্দেশে সেই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেন বলেন, ডাইং একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। মাঝপথে গ্যাস চলে গেলে পুরো কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে সমিতিভুক্ত প্রায় দেড়শ কারখানার উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে অনেক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
তবে আড়াইহাজারের মিথিলা টেক্সটাইল অ্যান্ড ওভেন ডাইং লিমিটেড আগে থেকেই বায়োমাসভিত্তিক জ্বালানির ব্যবস্থা করায় উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোহাম্মদ মাহবুব খান হিমেল বলেন, দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট বিবেচনায় রেখে আগেই বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। এখন সেটিই কাজে লাগছে।
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন
সংকটে পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোও। রাজধানী থেকে জেলা শহর– সবখানেই গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ নেই। অনেক স্টেশন দিনের বড় অংশ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যেসব স্টেশন খোলা রয়েছে, সেখানেও দীর্ঘ লাইন।
সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, একটি স্টেশন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাস চাপ প্রয়োজন। কিন্তু এখন অনেক এলাকায় ৪ থেকে ৫ পিএসআই, কোথাও আবার ২ পিএসআইয়ের কম চাপ পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, মালিবাগ, বিমানবন্দর এলাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ ও নরসিংদীর বিভিন্ন স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা। কোথাও দিনের মধ্যে একাধিকবার সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
মালিবাগের সিটি ওভারসিজ সিএনজি স্টেশনে অপেক্ষমাণ চালক ইমরুল হাসান গতকাল সোমবার বলেন, ‘সকাল ১০টায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর জানানো হলো– গ্যাস নেই। এখন অন্য একটি পাম্পে যেতে হবে। সেখানেও গ্যাস পাব কিনা, জানি না। সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে গাড়ি চালাব কখন?’
আবাসিকে রান্না প্রায় বন্ধ
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা, বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলপিজি, ইন্ডাকশন কুকার কিংবা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছে। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন পরের দিনের রান্না সেরে রাখছেন।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আসমা বেগম বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। সমকাল
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com