রাঙ্গামাটি:- টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড়ধসে গত সপ্তাহে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি। জেলার প্রায় সবকটি উপজেলাই বন্যা, পাহাড়ধস ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়। বৃষ্টি বন্ধ হওয়ায় নদী-খাল ও হ্রদের পানি নামতে শুরু করেছে। অনেক এলাকায় পানি নেমে গেলেও দুর্ভোগ কাটেনি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন ঘরবাড়ি পরিষ্কার, ভাঙা সড়ক মেরামত, জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং খাদ্যসংকট মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, লংগদু, কাপ্তাই, কাউখালী, নানিয়ারচর, রাজস্থলী এবং রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা। পাহাড়ি ঢলে অসংখ্য গ্রাম প্লাবিত হয়, বহু বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যায় এবং কৃষিজমি, মাছের ঘের ও সবজিক্ষেত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে বসতবাড়ি ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং কয়েকটি বাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। লংগদুতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একজনের মৃত্যু হয় এবং সদর উপজেলার লাইল্যাঘোনাসহ কয়েকটি এলাকায় পাহাড়ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী অসংখ্য পরিবার আতঙ্কে ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে বাধ্য হয়।
বন্যার সময় রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক, রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়কসহ জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পাহাড়ধসের কারণে যান চলাচল বারবার বন্ধ হয়ে যায়। সাজেকগামী সড়কের বিভিন্ন স্থানে ধস নামায় পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং শত শত পর্যটক আটকা পড়েন। পরে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের সহায়তায় তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। এখনও বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কে ভাঙন, কাদা ও ধসের কারণে স্বাভাবিক যোগাযোগ পুরোপুরি ফিরেনি।
বন্যা পরিস্থিতির সময় জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী কয়েক হাজার মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেন। তবে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মাঠপর্যায়ে অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে প্রশাসনের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি। কোথাও আশ্রিতের সংখ্যা অতিরঞ্জিত, আবার কোথাও প্রকৃত ভুক্তভোগীরা সরকারি তালিকায় স্থান পাননি বলে অভিযোগ ওঠে।
আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, শিশু খাদ্য ও চিকিৎসাসেবার ঘাটতির অভিযোগ করেন আশ্রিতরা। অনেক কেন্দ্রে পর্যাপ্ত টয়লেট না থাকায় নারী, শিশু ও বয়স্করা চরম দুর্ভোগে পড়েন। রান্না করা খাবার অনিয়মিত ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। ত্রাণ বিতরণেও সমন্বয়হীনতা, তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে।
তবে জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দুর্গত মানুষের মাঝে খাদ্য, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। বিজিবি দুর্গম এলাকায় নৌকাযোগে ত্রাণ পৌঁছে দেয় এবং সেনাবাহিনী উদ্ধার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এদিকে বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার পর কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা ধীরে ধীরে কমছে। প্লাবিত এলাকার অধিকাংশ বাড়িঘর থেকে পানি নেমে গেলেও চারদিকে কাদা, নষ্ট আসবাবপত্র, ক্ষতিগ্রস্ত ফসল ও ভেঙে যাওয়া অবকাঠামোর চিত্র এখনো স্পষ্ট। অনেক পরিবার ঘরে ফিরলেও রান্নার উপকরণ, নিরাপদ পানীয় জল এবং কর্মসংস্থানের সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে এখনো আতঙ্ক কাটেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্যোগ শেষ হলেও পুনর্বাসনের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন, বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ, কৃষকদের ক্ষতিপূরণ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কার এবং পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রাঙ্গামাটির এই দুর্যোগ আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং দুর্বল অবকাঠামো বর্ষা মৌসুমে জেলার মানুষের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই শুধু ত্রাণ নয়, টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পুনর্বাসন এবং পাহাড় সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com