গোলাম মওলা:- দেশের বাজারে আবারও বাড়তে শুরু করেছে মানুষের দৈনন্দিন খরচ। ভোজ্যতেল, সবজি, রান্নার গ্যাস থেকে শুরু করে যাতায়াত—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়ার নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে নিত্যপণ্যের বাজারে ধীরে ধীরে মূল্যচাপ বাড়ছে। ফলে আয় স্থির থাকলেও মানুষের খরচ বাড়তে শুরু করায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়া, এলপিজি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয়ের হিসাব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি খাতে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই ব্যয়চাপ আরও বাড়তে পারে।
ভোজ্যতেলের বাজারে নতুন চাপ
সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে খোলা ভোজ্যতেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে খোলা পাম অয়েল ও সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৭ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, পাইকারি বাজারে হঠাৎ করে প্রতি ড্রামে প্রায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। ফলে ভোক্তাদের বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় পরিবহন খরচ বাড়ছে। এর ফলে আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ঈদুল ফিতরের আগেই ভোজ্যতেলের দাম কিছুটা বাড়ার প্রবণতা ছিল। তবে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার পর বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এলপিজির দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বৃদ্ধি
মানুষের খরচ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রান্নার গ্যাসের বাজারে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এপ্রিল মাসের জন্য এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করেছে। নতুন ঘোষণায় ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৭২৮ টাকা। গত মাসে এর দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে প্রায় ৩২ টাকা ৩০ পয়সা। সাম্প্রতিক সময়ে এটিই এলপিজির সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) বিকালে নতুন এই মূল্য ঘোষণা করেন, যা একই দিন সন্ধ্যা থেকে কার্যকর হয়েছে।
নতুন হিসাব অনুযায়ী প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪৪ টাকা ৪ পয়সা। এই হিসাবে বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত হবে। তবে বাজারে নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি নিয়ে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে বলে ভোক্তাদের অভিযোগ।
অপরদিকে গাড়িতে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বেড়েছে। নতুন দর অনুযায়ী প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা, যা আগের তুলনায় প্রায় ১৮ টাকা বেশি।
আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়ছে দ্রুত
অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো—আয়ের তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আংশিক চালু রয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে উৎপাদন কমে গেছে। এতে অনেক শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন বা কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। শ্রমিকদের অনেকেরই ওভারটাইম কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে মাসিক আয় কমে যাচ্ছে। একই সময়ে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও যাতায়াত ব্যয় বাড়ায় তাদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। পরিবহন খাতেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক স্থানে যানবাহন চলাচল কমে গেছে। ফলে চালক, হেলপার এবং রাইড শেয়ারিং-সেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয় কমছে।
এদিকে সীমিত সংখ্যক পরিবহন চলাচল করায় অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে যাত্রীদের যাতায়াত ব্যয় বেড়েছে।
উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি
জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ডিজেল সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘‘জ্বালানির সঙ্গে অর্থনীতির প্রায় সব খাতের সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে ডিজেল সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে পণ্যের উৎপাদন ও বিপণন উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হয়েছে।’’ তার মতে, পরিবহন সীমিত হওয়ায় অনেক সময় পণ্য বাজারে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। এতে সরবরাহ কমে গিয়ে বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
কৃষি খাতেও বাড়ছে ঝুঁকি
জ্বালানি সংকটের প্রভাব কৃষি খাতেও পড়তে শুরু করেছে। সেচের জন্য ডিজেলের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা থাকায় সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১৩ শতাংশ। একইসঙ্গে কর্মসংস্থানের দিক থেকেও এটি অন্যতম বড় খাত। ফলে কৃষি উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটলে খাদ্য সরবরাহ এবং বাজারের মূল্য পরিস্থিতির ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
এছাড়া সার উৎপাদন ও পরিবহনের ক্ষেত্রেও জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষি খাতের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খানের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বাড়তে পারে। তার মতে, যদি দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম ১২০ ডলারের বেশি থাকে, তাহলে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দ্রুত দেশের অর্থনীতিতে পড়ে।’’
সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘‘জ্বালানি এমন একটি খাত, যার সঙ্গে অর্থনীতির প্রায় সবক্ষেত্র জড়িত। ফলে জ্বালানি সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব উৎপাদন, পরিবহন, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়ে। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পরিচালন ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘‘বর্তমানে দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলার। বাজেটের একটি বড় অংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন করে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে অর্থনীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।’’
সামনে বাড়তে পারে মূল্যচাপ
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বাজারে দ্বিতীয় ধাপের মূল্যস্ফীতি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ প্রথমে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে, এরপর উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়বে, এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্য ও সেবার দামে তার প্রভাব পড়বে। এ অবস্থায় মানুষের খরচ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং উৎপাদন খাত সচল রাখার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষি, পরিবহন এবং রফতানিমুখী শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাজারে মূল্যচাপ পুরোপুরি কমার সম্ভাবনা কম। ফলে মানুষের ব্যয় বৃদ্ধির এই প্রবণতা আপাতত অব্যাহত থাকতে পারে।
বাংলা ট্রিবিউন
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com