
ডেস্ক রির্পোট:- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন-ইসরায়েলি স্থাপনা লক্ষ্য করে চতুর্মুখী সাঁড়াশি হামলা চালিয়েছে ইরান। গতকাল ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় দেশ কুয়েত, জর্ডান, সৌদি আরব ও ইরাকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এসব হামলা চালায় দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। হামলায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেল ও পানিশোধনাগারসহ সামরিক ঘাঁটি ও বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের হামলায় শুধু ইসরায়েলেই আহত হয়েছেন ২৩২ জন। এ ছাড়া কুয়েতে বিদ্যুৎ ও পানিশোধনাগারে হামলায় এক ভারতীয় নিহত এবং সামরিক ঘাঁটিতে হামলায় ১০ সেনা আহত হয়েছেন। এদিকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনার মাঝেও থেমে নেই পাল্টাপাল্টি হুমকি। ইরানের জ্বালানি তেল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি বেসামরিক বিদ্যুৎ স্থাপনা, তেলকূপ এবং খার্গ দ্বীপে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জবাবে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি ওমান উপসাগরও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের এক মাস পেরিয়েছে। গতকাল যুদ্ধের ৩১তম দিনে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন অবকাঠামো লক্ষ্য করে সাঁড়াশি হামলা চালিয়েছে ইরান। গতকাল ইসরায়েলের শিল্প এলাকা লক্ষ্য করে ব্যাপক মিসাইল হামলা চালায় আইআরজিসি। হামলায় হাইফায় অবস্থিত ইসরায়েলের প্রধান তেল শোধনাগারে আগুন ধরে যায়। হামলার পর শোধনাগার এলাকা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। পাশাপাশি ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলের বিরশেবা শহরে একটি রাসায়নিক কারখানায় আঘাত হানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র। এতে আশপাশের বাসিন্দাদের ঘরের ভিতরে থাকতে এবং জানালা বন্ধ রাখতে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ, কারণ সেখানে বিপজ্জনক রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়াও ইসরায়েলজুড়ে একসঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট হামলা চালিয়েছে ইরান ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। এসব হামলায় গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অন্তত ২৩২ জন আহত ব্যক্তি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তাদের ২৬১ জন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কতজন সেনা মারা গেছেন, সেই সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
ইসরায়েল ছাড়াও ইরাকের রাজধানী বাগদাদের পশ্চিমে অবস্থিত মার্কিন ‘ভিক্টরি বেস’ ঘাঁটিতে গতকাল ভোরে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। রকেট হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ইরাকি স্পেশাল ফোর্সের একটি ‘এ-৩২০বি’ পরিবহন উড়োজাহাজে আঘাত করলে সেটিতে আগুন ধরে যায়। প্রথমবারের মতো মার্কিন ভিক্টরি ঘাঁটি সরাসরি হামলার শিকার হলো। তবে বর্তমানে সেখানে কোনো মার্কিন সেনা নেই।
কুয়েতের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় দেশটির অন্তত ১০ সেনাসদস্য আহত হয়েছেন। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কর্নেল সৌদ আবদুল আজিজ আল-আতওয়ান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় কুয়েতের আকাশসীমায় ১৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২টি ড্রোন শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি সামরিক ঘাঁটি হামলার শিকার হয়েছে। এতে ১০ জন সেনা আহত হয়েছেন। তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হামলায় শিবিরের কিছু অবকাঠামোগত ক্ষতিও হয়েছে। এ ছাড়াও ইরানের হামলায় কুয়েতের একটি বিদ্যুৎ ও পানিশোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় সেখানে কর্মরত এক ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন।
জর্ডানের মায়াফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের আবাসন এলাকা ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়। ইরানি সেনাবাহিনীর দাবি, এই ঘাঁটিটি ইরানের ওপর বিমান হামলা পরিচালনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এ ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ১১টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৭টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। চলমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তারা এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯৪১টি ড্রোন এবং ৪৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। একই সময়ে বাহরাইনও তাদের আকাশসীমায় ৮টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৭টি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছে। বাহরাইন প্রতিরক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে এ পর্যন্ত মোট ১৮২টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৯৮টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।
ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও খার্গ দ্বীপ ধ্বংসের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের : ইরানের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামো, তেলকূপ এবং খার্গ দ্বীপ ধ্বংস করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি তেহরান পুনরায় উন্মুক্ত করে না দিলে এ হামলা চালানো হবে বলে জানান তিনি। গতকাল এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প সতর্ক করেন, ‘যদি কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো না যায়, তবে এ সংঘাত আরও তীব্র হবে। যদি কোনো কারণে দ্রুত চুক্তি না হয়, আমরা তাদের সব বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, তেলকূপ ও খার্গ দ্বীপ নিশ্চিহ্ন করে দেব।’
হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি ওমান উপসাগরও এখন আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে, দাবি ইরানের : হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি ওমান উপসাগরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইরানের সামরিক বাহিনীর হাতে রয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির নৌবাহিনীর একজন কমান্ডার। ওই অঞ্চলে মোতায়েনরত মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী অপেক্ষায় রয়েছে কখন মার্কিন সৈন্য তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় আসবে। সীমার মধ্যে এলেই উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
ওই কমান্ডার আরও বলেন, হরমুজ প্রণালির পূর্বাঞ্চল এবং ওমান উপসাগর বর্তমানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নৌবাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৎপরতা ও সামরিক মহড়ার মুখে মার্কিন রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ইরানি জলসীমা থেকে শত শত মাইল দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
২০ হাজার ডলারের ড্রোনে ৭০ কোটির মার্কিন নজরদার বিমান ধ্বংস, দাবি আইআরজিসির : ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মাত্র ২০ হাজার ডলারের একটি শাহেদ-১৩৬ ড্রোন ব্যবহার করে ৭০ কোটি ডলারের একটি বোয়িং ই-৩ সেন্ট্রি নজরদার বিমান ধ্বংস করা হয়েছে। এক বিবৃতিতে বাহিনীটি জানায়, সন্ত্রাসী মার্কিন সেনাবাহিনীর শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের জবাবে আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্স যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অভিযানে এয়ারবর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (এডব্লিউএসিএস) নামে পরিচিত একটি ই-৩ সেন্ট্রি নজরদার বিমান সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত একটি সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি অভিযানে মার্কিন বিমান বাহিনীর নজরদার বিমানটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে এবং আশপাশের অন্যান্য বিমানও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এক মাসে মধ্যপ্রাচ্যের ৭ দেশে ৫ হাজার ৪৭১ বার হামলা চালিয়েছে ইরান : যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের এক মাসে মধ্যপ্রাচ্যের ৭ দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান, বাহরাইন ও জর্ডানে মোট ৫ হাজার ৪৭১ বার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে তেহরান। মূলত এসব দেশের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা পরিচালনা করা হলেও বেশ কয়েকবার এই সাত দেশের সরকারি, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি স্থাপনাও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের শিকার হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আঘাত এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর। দেশটিতে অবস্থিত দুই মার্কিন ঘাঁটি এবং আমিরাতের সরকারি অবকাঠামোগত ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে গত এক মাসে মোট ৪১৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১ হাজার ৯১৪টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে আছে কুয়েত। দেশটিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৩টি সেনাঘাঁটি আছে। এসব ঘাঁটি এবং কুয়েতের অবকাঠামোগত ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ৩০৯টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ৬১৬টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান। তৃতীয় স্থানে আছে কাতার। এই দেশটিকে লক্ষ্য করে গত এক মাসে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী ২০৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৯৩টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com