রাঙ্গামাটি:-পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’কে ঘিরে রাঙ্গামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ি জনপদে শুরু হয়েছে উৎসবের ব্যাপক প্রস্তুতি। চৈত্র সংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে জেলার সর্বত্র এখন সাজ সাজ রব বিরাজ করছে। বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা ও বিহুকে ঘিরে স্থানীয় বাজারগুলোতে বেড়েছে মানুষের উপস্থিতি।
শহরের বনরূপা, তবলছড়ি ও রিজার্ভ বাজারসহ বিভিন্ন উপজাতীয় হাটে উৎসবের কেনাকাটা এখন তুঙ্গে। ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও বিশেষ খাবারের উপকরণ কিনতে ভিড় করছেন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষজন। চাকমাদের পিনোন-হাদি, মারমাদের থামি এবং ত্রিপুরাদের রিনাই-রিসার দোকানে তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আধুনিক নকশার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী বুননের পোশাকের চাহিদাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘পাঁচন’ রান্নার প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। বহু ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী খাবারের জন্য বাজারে উঠতে শুরু করেছে বাঁশকোড়ল, তারা, বিভিন্ন পাহাড়ি আলু ও বুনো সবজি। স্বাদের ভিন্নতা আনতে অনেকে এতে শুকনো মাছ (সিদল) ব্যবহার করেন, যদিও নিরামিষভাবেও এটি প্রস্তুত করা হয়।
জেলা পরিষদের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে বৈসাবি মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এসব মেলায় ঘিলা খেলা, বলি খেলার মতো ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মহড়া চলছে পাড়ায় পাড়ায়।
স্থানীয় এক বিক্রেতা জানান, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের বাজারে মানুষের সমাগম অনেক বেশি। শুধু কেনাকাটাই নয়, উৎসবের আবহ উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরাও ভিড় জমাচ্ছেন।
আগামী ১২ এপ্রিল ‘ফুল বিজু’র মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে। এদিন কাপ্তাই হ্রদের পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো বছরের গ্লানি মুছে ফেলার প্রতীকী আয়োজন করা হবে। ১৩ এপ্রিল মূল বিজু বা বৈসু উপলক্ষে ঘরে ঘরে পাঁচন রান্না ও অতিথি আপ্যায়ন অনুষ্ঠিত হবে। ১৪ এপ্রিল গজ্যাপজ্যা বা সাংগ্রাই উপলক্ষে জলকেলির মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করা হবে।
উৎসবকে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ। পর্যটন কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বাড়তি নজরদারি রাখা হয়েছে, যাতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পারেন।
পাহাড়ের এই বৈচিত্র্যময় উৎসব এখন কেবল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং সকল জাতি-ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে এটি একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
পাঁচন: বৈসাবির ঐতিহ্যবাহী পদ
বৈসাবি উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ‘পাঁচন’—বহু উপকরণে তৈরি একটি বিশেষ তরকারি। এতে সাধারণত বাঁশকোড়ল, তারা (বুনো কচু জাতীয় গাছ), বিভিন্ন প্রজাতির পাহাড়ি আলু, শিম বিচি, মটরশুঁটি এবং নানা বুনো শাকসবজি ব্যবহার করা হয়। স্বাদের জন্য অনেকে শুকনো মাছ বা সিদল যোগ করেন।
রান্নার ক্ষেত্রে সব উপকরণ সমান আকারে কেটে ধুয়ে নিতে হয়। শক্ত সবজি আগে সিদ্ধ করে পরে নরম শাকসবজি যোগ করা হয়। সামান্য পানি, লবণ, আদা ও কাঁচামরিচ দিয়ে কম আঁচে দীর্ঘ সময় রান্না করা হয়। সব উপকরণ একসঙ্গে মিশে আঠালো ঘনত্ব তৈরি হলে নামিয়ে পরিবেশন করা হয়।
এই ঐতিহ্যবাহী খাবার বৈসাবির সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও খাদ্যসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com