মো. বায়েজিদ সরোয়ার:- গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণ ইরানে যেমন ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে, তেমনি পুরো মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন-মৃত্যুর এ ঘটনা আগ্রাসনের প্রতীক হয়ে থাকবে। আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে চালানো আকস্মিক ও অবৈধ এ হামলা বিশ্বের ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার চরম চ্যালেঞ্জের মুখে। বাস্তবে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা যেন এক ‘মগের মুল্লুক’।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরাইল আরেকবার প্রমাণ করল-চূড়ান্ত ক্ষমতার কাছে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল্য কতটা ঠুনকো। গত ৩ জানুয়ারি ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টার পর ইরানে এ যৌথ হামলার মাধ্যমে বিশ্বে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি যেন প্রতিষ্ঠিত হলো। ইরানে এ আগ্রাসনের পর বিশ্বের সব দুর্বল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী ও আগ্রাসী প্রতিবেশী দেশের কাছে আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়ল।
ইরানের বর্তমান শাসকদের বিরুদ্ধে ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণকে দমন-পীড়নের অনেক অভিযোগ আছে। গত জানুয়ারিতে ইরানের বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ব্যাপক বলপ্রয়োগে দমন করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বাইরে থেকে এ ধরনের আগ্রাসন চালিয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের (রেজিম চেঞ্জ) চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ চেষ্টা একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি চরম অসম্মান। ইরানের ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষমতা শুধু ইরানের জনগণের হাতেই থাকতে হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে (২০ জানুয়ারি ২০২৫) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর নিজেকে একজন যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিকামী প্রেসিডেন্ট হিসাবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেন। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করা এবং সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনার ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে তার নেতৃত্বেই বিশ্ব বড় ধরনের অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে এগিয়েছে।
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অপহরণের পর গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন ট্রাম্প। কিউবা ও কলম্বিয়াকে নেতৃত্ব পরিবর্তনের ভয় দেখান। আট মাস আগে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ওপর আক্রমণ চালায় যুক্তরাষ্ট্র। শুল্ক যুদ্ধের মাধ্যমে এক বছর ধরে বিশ্বে উল্লেখযোগ্য অস্থিরতা সৃষ্টির পর এবার ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে আগ্রাসনের মাধ্যমে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে মারাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়েছে, শিগগির এ যুদ্ধ থামার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বব্যবস্থার অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। পুরো বিশ্বে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, সার্বভৌমত্ব কোনো কিছুরই তোয়াক্কা না করে দেশে দেশে হামলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে। অদূর ভবিষ্যতে গোটা বিশ্বে শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হতে পারে।
এতকাল যে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চর্চা হয়েছে, সেটি আগামী দিনে ক্ষমতা, সামরিক ও পারমাণবিক শক্তির বিচারে নির্ধারিত হতে পারে। বদলে যেতে পারে পুরো পৃথিবীর চেহারা। ভেঙে পড়তে পারে বিশ্বব্যবস্থা। এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো ছোট ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো আঞ্চলিক শক্তিশালী রাষ্ট্রের রোষানলের শিকার হতে পারে।
এদিকে ইরানে হামলাসহ বিশ্বব্যবস্থার নানা ইস্যুতে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে সারা বিশ্বে প্রশ্ন উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে হামলা-পালটা হামলায় জাতিসংঘ গভীর উদ্বেগ জানালেও কার্যকর কিছু করতে পারছে না। তবে সংস্থাটি সব পক্ষকে সংযত থাকার এবং দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। মার্কিন পরাশক্তির বিরোধী শক্তি চীন ও রাশিয়া কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করছে না। ঘটনার পর দেশ দুটির শীর্ষনেতারা শুধু নানা বক্তব্য দিয়েছেন। চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা কেবল নিরাপত্তা পরিষদে শক্ত ‘রেটোরিট’ ব্যবহারের মধ্যেই সীমিত।
যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি মদদে মধ্যপ্রাচ্যের নব্য হিটলার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে দুর্বল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলতে কিছুই নেই। গাজায় ২০ হাজার শিশু হত্যাসহ একটি প্রাচীন জনপদ সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে গণহত্যাকারী ইসরাইলি বাহিনী। ক্ষমতায় মদমত্ত পশ্চিমা বিশ্বের নেতারা যে ডকট্রিন নিয়ে এগোচ্ছেন, তাতে যে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র অপছন্দ হলেই তার পড়শি দুর্বল দেশের বৈধ শাসককে উৎখাত ও হত্যার লাইসেন্স পেতে যাচ্ছে। গত এক বছরে এ প্রবণতা জঙ্গলের আইনকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠছে, পৃথিবীর চাকা কি উলটো দিকে ঘুরে আবার বর্বর যুগে ফিরে যাচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, ইরাক, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি (২৭টি) লক্ষ্য করে প্রতিশোধমূলক পালটা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এখন পর্যন্ত এ হামলায় দুজন বাংলাদেশি নিহত ও সাতজন আহত হয়েছে। ইরানে হামলা-পালটা হামলার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে ‘সাতটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের’ নিন্দা জানিয়ে গত ১ মার্চ বিবৃতি দেয় বাংলাদেশ সরকার। আরব রাষ্ট্রগুলোতে ইরানের সাম্প্রতিক পালটা আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যে ধরনের যৌথ হামলা হচ্ছে, তা চরম নিন্দনীয়। এ আগ্রাসন কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। এর বিরুদ্ধে শুধু মুসলিম বিশ্ব নয়, বরং সব দেশকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে-যাতে আর কোনো দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত না হয়। অন্যথায় পৃথিবী ফিরে যাবে আদিম যুগে, যেখানে শুধু শক্তির জোরেই সবকিছুর মীমাংসা হতো। বর্তমানে বিশ্বে এ ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি মেনে নেওয়ার নয়। তাই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
এ সংঘাত থেকে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো কিছু শিক্ষা নিতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল অনুমান করেছিল, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করলেই দেশটিতে সরকার পরিবর্তন করা যাবে। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে উলটো। এ আগ্রাসন ইরানিদের এক করেছে। ইরান শুধু ব্যাপকভাবে আক্রমণ প্রতিহত করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশের ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণ করেছে। যুদ্ধ দীর্ঘতর হলে ইরান কতদিন টিকে থাকতে পারবে, এ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু গত ৫ দিনে ইরান প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য দেখিয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে ইরান দীর্ঘ পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজেদের তৈরি প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ার ফলে, বিশেষত মিসাইল ও ড্রোন।
এ পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জন ও প্রযুক্তির আধুনিকায়ন করতে হবে। প্রয়োজন নিজেদের তৈরি প্রতিরক্ষা শিল্প। ঐতিহ্যগত সামরিক শক্তির চেয়ে বর্তমান যুগে ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ (এসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার) ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের জন্য বেশি কার্যকর। প্রয়োজন ড্রোনের মতো সাশ্রয়ী প্রযুক্তি। একইসঙ্গে আঞ্চলিক ও কৌশলগত জোট গঠন করতে হবে। প্রয়োজন সতর্ক কূটনীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা।
ইরান ও ভেনিজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্ববিবেকের কাছে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘ এ আগ্রাসন রুখতে ব্যর্থ হয়, তবে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা চিরতরে বিপন্ন হবে। বিশ্বশান্তি বজায় রাখার জন্য আন্তর্জাতিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন এখন সময়ের দাবি।
বিপজ্জনক এ ইরান যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ, ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর সক্রিয় ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। সামরিক নয়, কূটনৈতিক পদক্ষেপই উত্তেজনা প্রশমন ও সংঘাতের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ। সব পক্ষ সংযত ও দায়িত্বশীল হলেই কেবল বিশ্ব ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে পারে। এ যুদ্ধকে আমাদের ‘না’ বলতে হবে।
বাংলাদেশের জনগণের কাছে ইরান একটি আবেগের নাম। ইরানে আগামী ২১ মার্চ থেকে শুরু হবে ঐতিহ্যবাহী ‘নওরোজ’ বসন্ত উৎসব। অথচ এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান ও মিসাইল আক্রমণে ইরান বিধ্বস্ত। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে দেশটি ইরাক ও লিবিয়ার মতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে। কূটনৈতিক পদক্ষেপই উত্তেজনা প্রশমন ও সংঘাতের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ। এ যুদ্ধ এখনই বন্ধ করতে হবে। এর জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। গোলাপ, টিউলিপ আর বিখ্যাত কবিদের দেশ ও প্রাচীন সভ্যতার দেশ ইরান বিদেশি আক্রমণ থেকে মুক্তি পাক। শান্তি আসুক মধ্যপ্রাচ্যে।
মো. বায়েজিদ সরোয়ার : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com