শামসুল আলম:- পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বাস্তবতা বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতির তুলনায় জটিল ও বহুমাত্রিক। জাতিগত বৈচিত্র্য, উন্নয়ন বৈষম্য, নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির প্রশ্ন—সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের শাসন ও প্রতিনিধিত্ব একটি সংবেদনশীল ইস্যু। এই প্রেক্ষাপটে দীপেন দেওয়ানের উত্থান এবং মন্ত্রীত্ব লাভ পার্বত্য রাজনীতির ধারায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।
বিশেষ তাৎপর্য হলো—মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার ২৯ বছর পর প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী পেল পার্বত্য রাঙ্গামাটি, যার দায়িত্বে রয়েছেন দীপেন দেওয়ান। এটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং রাঙ্গামাটি জেলার রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য-----
দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক চেতনার শিকড় প্রোথিত তার পারিবারিক ঐতিহ্যে। তার পিতা স্বর্গীয় সুবিমল দেওয়ান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক সামাজিকীকরণে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তাকে প্রারম্ভিক পর্যায়েই সাংগঠনিক রাজনীতির সাথে যুক্ত করে।
শিক্ষা ও আদর্শিক বিকাশ---
রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে ছাত্রদলের সংগঠক হিসেবে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করে তিনি পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর আইন বিভাগে অধ্যয়ন করেন। সেখানে সহপাঠী ছিলেন সালাউদ্দিন আহমেদ।
আইন শিক্ষা তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি দেয়, যা পরবর্তীতে সংকটকালে আইনি ও রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে সহায়ক হয়।
জুডিশিয়াল সার্ভিস ও প্রশাসনিক দক্ষতা-----
৭ম বিসিএসের মাধ্যমে জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দিয়ে তিনি ১৯ বছর দায়িত্ব পালন করেন এবং সিনিয়র যুগ্ম জেলা জজ পদে উন্নীত হন। বিচার বিভাগীয় অভিজ্ঞতা তাকে প্রশাসনিক কাঠামো, আইন প্রয়োগ ও সংঘাত ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে তোলে—যা রাজনৈতিক নেতৃত্বে একটি কৌশলগত সুবিধা হিসেবে কাজ করে।
রাজনীতিতে পুনঃপ্রবর্তন (২০০৫)
দলীয় সংকটের সময়ে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি স্বেচ্ছায় বিচার বিভাগীয় চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। এটিকে রাজনৈতিক তত্ত্বের আলোকে আদর্শিক অঙ্গীকারের জন্য পেশাগত নিরাপত্তা ত্যাগের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যায়।
১/১১-পরবর্তী সংকট ও সাংগঠনিক পুনর্গঠন
১/১১-পরবর্তী দমন-পীড়নের সময়ে রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির কার্যালয় সচল রাখা এবং তৃণমূলকে সংগঠিত করার মাধ্যমে তিনি সাংগঠনিক দৃঢ়তার পরিচয় দেন।
তার নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল—
সংকটকালে প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণ
তৃণমূলভিত্তিক পুনর্গঠন
দলীয় ঐক্য রক্ষা
আইনি ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ
জেলা বিএনপির সভাপতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি
খালেদা জিয়ার মুক্তির পর তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও পরে সভাপতি হন। তার গঠিত কমিটিতে বিভিন্ন জাতিসত্তার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়। পার্বত্য অঞ্চলের বহুজাতিক বাস্তবতায় এই অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল দলীয় বিস্তার ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।
পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীত্ব: ঐতিহাসিক তাৎপর্য----
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার ২৯ বছর পর প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হিসেবে রাঙ্গামাটির প্রতিনিধিত্ব পাওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
এই প্রেক্ষাপটে দীপেন দেওয়ানের মন্ত্রীত্বকে কয়েকটি মাত্রায় বিশ্লেষণ করা যায়—
ক) আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের স্বীকৃতি
রাঙ্গামাটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রত্যাশার প্রতিফলন।
খ) প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার সদ্ব্যবহার
বিচার বিভাগীয় পটভূমি নীতিনির্ধারণে কাঠামোগত দক্ষতা যোগ করতে পারে।
গ) সম্প্রীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন
বহুজাতিক পার্বত্য অঞ্চলে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়নের সম্ভাবনা।
এই অর্জনকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিপক্বতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখা যায়।
সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা---
আজীবন সদস্য, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (রাঙ্গামাটি ইউনিট)
আজীবন সদস্য, এফপিএবি রাঙ্গামাটি
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, রাঙ্গামাটি আইন কলেজ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট
এই সম্পৃক্ততা তার নেতৃত্বকে কেবল দলীয় সীমায় আবদ্ধ রাখেনি; বরং সামাজিক পরিসরেও প্রভাব বিস্তার করেছে।
দীপেন দেওয়ানের জীবনপথ বিচার বিভাগ থেকে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীত্বে উত্তরণের একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত।
তার রাজনৈতিক যাত্রা বিশ্লেষণে তিনটি স্তম্ভ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
১. পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
২. প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা
৩. সংকটকালে নেতৃত্ব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি
পার্বত্য চট্টগ্রামের জটিল বাস্তবতায় তার মন্ত্রীত্ব ভবিষ্যতে উন্নয়ন, সম্প্রীতি ও নীতিনির্ধারণে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে—তা গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে থাকবে।
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com