শামসুল আলম:- পার্বত্য চট্টগ্রামে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে যারা সাধারণ নির্বাচনী প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন, তারা বাস্তবতাকে অস্বীকার করছেন। এখানে ভোট হচ্ছে না কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য; এখানে ভোট হচ্ছে—কে পাহাড় শাসন করবে, কে ভূমি নিয়ন্ত্রণ করবে, আর কে রাষ্ট্রকে কতটা পেছনে ঠেলে দিতে পারবে—তার এক নীরব গণভোটে।
খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান—এই তিন জেলার নির্বাচন একই সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় হলেও বাস্তবে তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চ। কোথাও উত্তেজনা নেই, কারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। কোথাও উত্তেজনা তুঙ্গে, কারণ সেখানে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রশ্ন সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে।
নীরব নির্বাচন মানেই কি অবাধ নির্বাচন?
রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে নির্বাচন যতটা শান্ত, বাস্তবতা ততটাই অস্বস্তিকর। প্রশ্ন হলো—এই শান্তি কার জন্য? ভোটার কেন উদাসীন? মাঠ কেন ফাঁকা?
কারণ স্পষ্ট—যেখানে আগেই ফল নির্ধারিত, সেখানে প্রতিযোগিতা নাটক মাত্র। জামায়াতে ইসলামী সরাসরি প্রার্থী না দিয়ে দুর্বল জোটসঙ্গী দাঁড় করিয়েছে, জেএসএস সরাসরি প্রার্থী দেয়নি, ইউপিডিএফ কোথাও অনুপস্থিত—সব মিলিয়ে একটি পরিকল্পিত নির্বাচনী শূন্যতা তৈরি করা হয়েছে। এতে বিএনপির প্রার্থীরা কার্যত “ওয়াকওভার” পাচ্ছেন।
কিন্তু এই ওয়াকওভার কি বিনা মূল্যে? নাকি এর বিনিময়ে পাহাড়ের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কিছু অলিখিত অঙ্গীকার লুকিয়ে আছে?
আঞ্চলিক শক্তির আসল কৌশল: নির্বাচন নয়, নিয়ন্ত্রণ
জেএসএস ও ইউপিডিএফকে কেবল রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তারা পাহাড়ে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের শক্তি। তারা জানে কোথায় নির্বাচন দরকার, আর কোথায় নির্বাচন অপ্রয়োজনীয়। এটা রাজনীতি নয়, এটা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র।
খাগড়াছড়ি: যেখানে রাষ্ট্র বনাম আঞ্চলিক শক্তির মুখোমুখি সংঘর্ষ,খাগড়াছড়িতে সব মুখোশ খুলে গেছে। এখানে নির্বাচন মানে কেবল এমপি নির্বাচন নয়—এটি পাহাড়ে রাষ্ট্র থাকবে কি থাকবে না, তার রায়।
আবদুল ওয়াদুদ ভুঁইয়ার মতো শক্তিশালী বাঙালি প্রার্থী মাঠে থাকায় আঞ্চলিক শক্তিগুলো চুপ থাকতে পারেনি। ফলে ইউপিডিএফ সরাসরি প্রার্থী দিয়েছে, জেএসএস পরোক্ষভাবে সক্রিয় হয়েছে, ভয়ভীতি ও হুমকির অভিযোগ সামনে এসেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যই বলে দেয় বাস্তবতা কতটা ভয়াবহ—২০৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৮৯টি ঝুঁকিপূর্ণ, ৬৮টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশ্ন হলো—এটি কি নির্বাচন, নাকি বলপ্রয়োগের অনুশীলন?
যেখানে মানুষ প্রতীক দেখে ভয় পায়, সেখানে ব্যালট বাক্স গণতন্ত্রের প্রতীক হতে পারে না।
বাঙালি বিভক্ত, আঞ্চলিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ
পার্বত্য রাজনীতির সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো—বাঙালিরা আজও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি, অথচ আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাদের লক্ষ্য নিয়ে স্পষ্ট ও সংগঠিত।
খাগড়াছড়িতে বাঙালি ভোট যদি বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ভাগ হয়, তাহলে পাহাড়ি ভোট সংগঠিতভাবে যেদিকে যাবে—ফলাফল বোঝা কঠিন নয়। এটি কৌশল, দুর্ঘটনা নয়।
ভোটের পরের বিপদ
এই নির্বাচন শেষ হলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠবে—এর মূল্য কে দেবে?
যদি আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব আরও বেড়ে যায়, তাহলে সেনা উপস্থিতি হ্রাস, জেলা পরিষদে পুলিশ হস্তান্তর, ভূমি কমিশনের মাধ্যমে ভূমি পুনর্বণ্টন—এসব সংবেদনশীল ইস্যু আবার সামনে আসবে। ইতিহাস বলে, এসবের প্রথম ভুক্তভোগী হয় বাঙালি জনগোষ্ঠী, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ।
২০০১ সালের অভিজ্ঞতা পাহাড় ভুলে যায়নি। রাষ্ট্র কি আবার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চায়?
শেষ কথা
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই নির্বাচন একটি সতর্ক সংকেত। গণতন্ত্রের নামে যদি ভয়ের রাজনীতি বৈধতা পায়, তাহলে তা শুধু পাহাড়ে নয়—পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।
এখনও সময় আছে। নির্বাচন মানে শুধু ভোটকেন্দ্র খোলা নয়—নির্বাচন মানে নাগরিকের নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা। পাহাড়ে যদি সেই ন্যূনতম শর্ত পূরণ না হয়, তবে এই নির্বাচন ইতিহাসে গণতন্ত্রের জয় হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের নীরব পশ্চাদপসরণ হিসেবেই চিহ্নিত হবে।
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com