পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দুহাতে কামিয়েছেন
বিশেষ প্রতিবেদক : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সদস্য (মূসক নীতি) জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার।
দুর্নীতিকে রীতিমত ‘শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি’ কয়েক বছরেই হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করে নিয়েছেন তিনি! আপনি ভুল পড়েননি, দুর্নীতিতে জাহাঙ্গীরের অর্জন হাজার কোটি টাকা।
জাহাঙ্গীর হোসেনের জন্মস্থান বরিশালের বানাড়ীপাড়া, চাউলাকাঠি গ্রামে। পাঁচ ভাই-পাঁচ বোনদের সবার বড় তিনি। প্রথম জীবনে তিনি চাকুরী শুরু করেন সিলেটের চা বাগানে। এরপর চাকুরী নেন ব্যাংকে। তারপর বিসিএস প্রশাসন। আবার ক্যাডার চেঞ্জ করে কাষ্টমসে।
দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহন করেছেন তিনি । দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহন করাও যে কারো কারো জীবন আলাদীনের চেরাগের সমতুল্য সেটাই প্রমাণ করে দিয়েছে এই জাহাঙ্গীর।
বিয়ে করেছেন এসএসসি পড়ার সময়ই। এক ছেলে এক মেয়ে তাদের। ছেলে-মেয়ে এবং স্ত্রীর নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন অনেক অবৈধ সম্পত্তি। কাস্টমসে চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেয়া রাজস্ব আহরনের টাকা সরকারী কোষাগারে রাখার চেয়ে তার নিজ কোষাগারেই রাখতেন বেশী।
বাংলাদেশে দুর্নীতির সমস্যা অনেক বেশি প্রকট। ব্যাংকখাত, শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে শিক্ষাখাত দুর্নীতির ছায়া থেকে রেহাই পায়নি৷ কিন্তু, একজন কর্মকর্তা যে চাকরি জীবন শুরু করেছিল কাস্টমস কর্মকর্তা, সে যখন একাই হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে যায়, তখন বোঝা যায় দুর্নীতিবাজদের শেকড় কতটা গভীর।
যেভাবে জাহাঙ্গীর একজন কাস্টমস অফিসার থেকে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিতে জড়িয়েছে?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাকুরীর প্রথম বছরের মধ্যেই ১০ লাখ টাকায় একটি হিন্দু পরিবারের বাড়ি ক্রয় করেন।
রাজধানী ঢাকার খিলগাঁওয়ে রয়েছে বহুতল ভবন। গুলসান সহ রাজধানী একাধিক স্থানে পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন একাধিক প্লট ও ফ্লাট।
বরিশাল শহরে কিনেছেন একাধিক বাড়ী। বরিশালের গুয়াচিত্রা এলাকায় রয়েছে ৫ একর বাগানবাড়ী। বরিশালের বানারীপাড়ায় কিনেছেন ৩৮ শতাংশ জমি।
এক ভাইকে খিলগাঁও এলাকায় ফ্লাট কিনে দিয়েছেন । অন্য ভাইদের নামে-বেনামে জমা রেখেছেন কোটি কোটি টাকা। ৫ বোনদের প্রত্যকের নামে ব্যাংকে ২৫ লক্ষ করে টাকা এফ.ডি.আর করে রেখেছেন।
বোনদের ছেলে-মেয়েদের নামে করেছেন কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি। বড় বোনের মেয়েদের নামে ঢাকায় ফ্লাট কিনেছেন। তার টাকায় ভাইদের মেয়েদের ঢাকায় বেসরকারী মেডিকেলে পড়াশোনা করাচ্ছেন ।
কয়েক বছর আগে বরিশালে তার গ্রামের বাড়ীতে দুটি মসজিদ নির্মান করেছেন। যার নির্মান ব্যায় ৭০ লাখ টাকা।
বানাড়ীপাড়ায় ব্যাবসায়ী গোলন্দাজ নামক এক ব্যাক্তির নিকট একশত কোটি টাকা দিয়ে তার ব্যাবসায়ীক পার্টনার হয়েছেন। কথিত আছে এই ব্যবসায়িক বিরোধেই তিনি ২২ মার্চ ২০১৫ সোমবার রাজধানীর বনানীতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন তিনি। সন্ধ্যা ৭টার দিকে জাহাঙ্গীর কোয়ার্টার এলাকার ভেতরে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। এ সময় একটি প্রাইভেট কারে চার যুবক ফটক দিয়ে ভেতরে ঢোকে। এর কিছুক্ষণ পরই গুলির শব্দ হয়। প্রাইভেটকার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় ওই যুবকেরা নিরাপত্তাকর্মীদের বাধার মুখে পড়েন। নিরাপত্তা কর্মীরা ফটক বন্ধ করে দেন। তবে যুবকদের অস্ত্রের মুখে নিরাপত্তাকর্মী ভয়ে ফটক খুলে দিতে বাধ্য হন।
যুবকেরা চলে যাওয়ার পর নিরাপত্তাকর্মীরা কোয়ার্টারের ভেতরে জাহাঙ্গীর আলমকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পান।
নতুন ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আইন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ২৩ মার্চ থেকে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন বা ইলেকট্রনিক বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নম্বর (ই-বিআইএন) চালু করা হয়। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন নিয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ৯৬৮টি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ উঠেছে, এর বড় একটি অংশই মূলত ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধন নিয়েছে।
কর গোয়েন্দারা জানান, ওই সময় অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরুর আগে ও পরে এই প্রক্রিয়ায় ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন মূসক নীতি সদস্য ব্যারিস্টার জাহাঙ্গীর হোসেন (অব.), ভ্যাট পলিসি সদস্য
ভ্যাট অনলাইন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও মানসম্মত করতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি সার্বিক দেখভালের দায়িত্বও ছিল তাদের ওপর। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়াটিতে কোনো ফল আসেনি।
ভ্যাট অনলাইন প্রজেক্ট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভুল ঠিকানা, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ভুল তথ্য, আইআরসি (ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট) ও ইআরসি (এক্সপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট) না থাকলেও সেগুলোর বানোয়াট তথ্য দিয়ে নিবন্ধন নিয়েছে অনেকে। আবার ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট প্ল্যান্ট না থাকলেও কেউ কেউ নিবন্ধিত হয়েছে ম্যানুফ্যাকচার হিসেবে। জানা গেছে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে শত কোটি টাকা লুফে নেন জাহাঙ্গীর।
জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে রাজস্ব আহরনের টাকা সরকারী কোষাগারে রাখার চেয়ে নিজ কোষাগারেই রাখতেন বেশী
ব্যারিস্টার জাহাঙ্গীর হোসেন বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত, ১-২-২০১৮ তারিখে তিনি অবসর গ্রহন করেন।
ফ্যাসিষ্ট এর সহযোগী জাহাঙ্গীর হোসেন:
স্থানীয়রা জানান, জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার বরিশালের বানাড়ীপাড়া, চাউলাকাঠি গ্রামে যুবক বয়স থেকেই লালন করেন দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী প্রবৃত্তি। আওয়ামীলীগের নেতা শেখ হাসিনা পরিষদের সভাপতি এবং শেখ রাসেল শিশু-কিশোর পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা এম মোয়াজ্জেম এর সাথে জড়িয়ে বেপড়োয়া হয়ে ওঠেন তিনি। অর্থ ও পেশিশক্তির রাজস্ব বোর্ডে ‘দুর্নীতির করে বাগিয়ে নেন হাজার হাজার কোটি টাকা। নানা অপকর্মে জড়িত জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে যেন অভিযোগের শেষ নেই।
জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার গত বছর জুলাই আগষ্ট গনঅভ্যুথনের সময় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা ক্যাপ্টেন এম মোয়াজ্জেম হোসেন, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বানচাল করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। তিনি এলাকায় আওয়ামী লীগের অর্থদাতা হিসেবে পরিচিত। জানা যায় শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর থেকে এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের তার নিজ অর্থায়নে আশ্রয় দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী আটক হয়েছেন তাদেরও নিয়মিত বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ দিয়ে ফিরিয়ে আনার চালাচ্ছেন পায়তারা।
টান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দুর্নীতিবাজ কর কর্মকর্তারা বড় ব্যবসায়ীদের যেমন কর ফাঁকিতে সহায়তা করেন, তেমন নিজেরা অবৈধ আয়কে বৈধ করতে আয়কর ফাইলে জালিয়াতি করেন। আয়কর গোয়েন্দারা তার অবৈধ সম্পদের তথ্য পেলে তাকে অবশ্যই বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে এটা যেহেতু দুর্নীতি, তাই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন. ‘যারা ন্যায় ও সততার সঙ্গে কর দিতে চান তাদের জন্য আয়কর অফিসের দরজা পার হওয়া কঠিন, আর যারা অসৎভাবে কর ফাঁকি দিতে চায় তাদের জন্য স্বর্গ। এটা তারই একটা বড় দৃষ্টান্ত।’
জাহাঙ্গীর হোসেনের দূর্নীতির ব্যপারে দুদকের এক উপ-পরিচালকের দৃষ্টি আর্কষন করা হলে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে বা পত্র-পত্রিকায় এ সংক্রান্ত কোন প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে আইনানুনাগ ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরো জানান বর্তমানে দেশব্যাপী প্রধান উপদেষ্টা ঘোষিত দূর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়ে গেছে অতএব, দূর্নীতির সামান্যতম লেশ পাওয়ামাত্র কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেওয়া হবেনা।
সাবেক আয়কর কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, তদন্তে যে কোনো সরকারি কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একজন সরকারি কর্মকর্তা চাকরি করে বৈধ পথে এত সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব নয়। এত সম্পদ করে থাকলে নিশ্চয়ই তিনি অবৈধ পথ অবলম্বন করেছেন।
খোদ এনবিআর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দাপটের সঙ্গে চাকরি করেন জাহাঙ্গীর। করদাতাদের কর ফাঁকি দিতে সহযোগিতা করে তিনি অঢেল অবৈধ অর্থ আয় করেন। অবৈধ পথে উপার্জিত এই অর্থ বৈধ করতে তিনি নানা কায়দায় নামে-বেনামে সম্পদ কেনেন। এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, দায়িত্ব পালনের সময় তিনি অবৈধ উপায়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করেন।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সদস্য (মূসক নীতি) জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদারের মোবাইল ফোনে শনিবার একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
প্রতিবেদন চলবে.....
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com