ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগে প্রভাষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রলীগের সাবেক এক কেন্দ্রীয় নারী নেত্রীর বোনকে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ ঘিরে এ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, যা ইতোমধ্যে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের পাঁচটি শাখা—ওয়াইল্ডলাইফ, প্যারাসাইটোলজি, ফিশারিজ, এন্টোমোলজি ও জেনেটিক্স—থেকে মোট তিনজন প্রভাষক নিয়োগের লক্ষ্যে গত ২৭ নভেম্বর মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে পরীক্ষার আগেই নির্দিষ্ট কয়েকজন প্রার্থীকে ঘিরে গুঞ্জন শুরু হলে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিয়োগ পেতে যাওয়া ওই প্রার্থী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক এক নেত্রীর বোন। অভিযোগ রয়েছে, অপেক্ষাকৃত ভালো একাডেমিক ফলাফল ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, ওয়াইল্ডলাইফ শাখায় আশিকুর রহমান সমী এবং প্যারাসাইটোলজি শাখায় জান্নাতুন নাহার ঝিনুকে শুরু থেকেই ‘প্রত্যাশিত প্রার্থী’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। বিশেষ করে জান্নাতুন নাহার ঝিনুর পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়।
অভিযোগ রয়েছে, জান্নাতুন নাহার ঝিনুর ভাই আমিনুল হক পলাশ বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক ও সভাপতি। তিনি সাবেক এনএসআই কর্মকর্তা এবং বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি নিয়মিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও সমালোচনা করে থাকেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এদিকে ঝিনুকে নিয়োগ দেওয়ার পেছনে তার সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ বোর্ডের অন্যতম সদস্য, শহীদুল্লাহ হলের বর্তমান প্রোভোস্ট ও সাদা দল সমর্থনকারী হিসেবে পরিচিত প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক আমিনুল ইসলাম ভুঁইয়ার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নিয়োগ বোর্ডের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ঝিনুর একাডেমিক ফলাফলকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বললেও অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, একই মানদণ্ড অন্য শাখাগুলোর ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওয়াইল্ডলাইফ শাখায় সুপারিশপ্রাপ্ত আশিকুর রহমান সমীর অনার্স সিজিপিএ ৩.৬৩ হলেও তার প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক প্রার্থীর সিজিপিএ ছিল ৩.৯১। তবুও তুলনামূলকভাবে কম ফলাফলধারী প্রার্থীকে এগিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ। একইভাবে ফিশারিজ শাখায় সম্ভাব্য প্রার্থী আনিকা তাবাসসুমও একাডেমিক ফলাফলের দিক থেকে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও সুপারিশ পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই দুই প্রার্থীই নীল দলের প্রভাবশালী শিক্ষকদের সমর্থনপুষ্ট।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রভাষক পদে পাবলিকেশন বা পূর্ব কাজের অভিজ্ঞতার কোনো শর্ত উল্লেখ ছিল না। বরং একাডেমিক ফলাফলকেই প্রধান মূল্যায়ন মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়েছিল। তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সেই নীতির ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, এর মাধ্যমে অধিকতর মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করা হয়েছে, যা মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থার পরিপন্থী।
এদিকে ওয়াইল্ডলাইফ শাখার প্রার্থী আশিকুর রহমান সমী বর্তমানে তথ্য উপদেষ্টার এপিএস হওয়ায় নিজের নিয়োগসহ অন্যদের নিয়োগেও প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, এ কারণে মূলধারার গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এর আগে নিয়োগ পরীক্ষায় তার বিরুদ্ধে সরকারি গাড়ি ব্যবহার ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
অভিযোগকারীদের মতে, জুলাই আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থী হয়ে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরপেক্ষতা ও ন্যায়ভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, “বোর্ডের পাঁচজন সদস্যের সর্বসম্মতিতেই প্রার্থীদের সুপারিশ করা হয়েছে। যাদের সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের মেধা, যোগ্যতা ও একাডেমিক রেকর্ডের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কারো রাজনৈতিক পরিচয় বা কেউ কারো পিএস বা এপিএস কিনা, এসব বিষয়ে আমার জানা ছিল না।”
একাডেমিক ফলাফলের তুলনায় কম যোগ্য প্রার্থী সুপারিশ পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সবক্ষেত্রে একাডেমিক রেজাল্টই একমাত্র মানদণ্ড নয়। অনেক সময় পাবলিকেশন বা অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়।”
তিনি আরও জানান, “বোর্ড সর্বসম্মতিক্রমে বিষয়টি সিন্ডিকেটে পাঠিয়েছে। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সিন্ডিকেট। কারো রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক সম্পর্ক থাকলে সেটি দেখার দায়িত্বও সিন্ডিকেটের।”
নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ও জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এনামুল হক বলেন, “এটি এখনো সিন্ডিকেটে অনুমোদিত হয়নি, তাই এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।”
বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, “আমি ওই নিয়োগ বোর্ডে ছিলাম না, তাই এ বিষয়ে কিছু জানি না।”
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com