প্রফেসর মো. আহসানুল হক (রোকন):- বাংলাদেশে ঈদুল আযহা উপলক্ষে কোরবানী পালন শুধু একটি ধর্মীয় রীতি নয়, এটি মানুষের আত্মত্যাগ ও মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের এক মহৎ উদাহরণ। হাজার বছর আগের সেই মহান ঘটনাটি এখনও আমাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে—যখন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর প্রিয় পুত্রসন্তানকে আল্লাহর আদেশ পালনে কোরবানী করতে চেয়েছিলেন, সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে নিজের অহংকার ও স্বার্থ পরিত্যাগের মাধ্যমে মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন যার মূল শিক্ষা—নিজের স্বার্থকে পরিত্যাগ করা, আল্লাহর বিধানকে ভালোবাসা, প্রাণি কোরবানীর মাধ্যমে নিজের অন্তরের হিংসা, বিদ্বেষ ও অহমিকার বিসর্জন এবং মানুষের কল্যাণে আত্মনিবেদন।
এই পবিত্র শিক্ষা এবং তাৎপর্য নিয়ে বাংলাদেশে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসল্লী পবিত্র ঈদুল আযহার দিন প্রাণি কোরবানী করেন। এটি আমাদের বিশ্বাস ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ, যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে নিবেদিত জীবনযাপনের পাশাপাশি সমাজে একে অপরের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতির বার্তা পৌঁছে দিই। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই মহান উৎসবের সঙ্গে জড়িত স্বাস্থ্য, প্রাণিকল্যাণ ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো সম্বন্ধে আমাদের সচেতন হতে হবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে মোট ১০,৪০৮,৯১৮ টি প্রাণি কোরবানী হয়েছে, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় এই সংখ্যা সর্বোচ্চ। পবিত্র ঈদুল আযহা দেশের
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, যেখানে হাজার হাজার কৃষক, ব্যবসায়ী এবং খুচরা বিক্রেতা এই সময় অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হন। দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসন নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কোরবানী নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট জবাইয়ের স্থান নির্ধারণ করে। ঢাকায় উত্তরা প্লেগ্রাউন্ড, আজিমপুর মাঠ, মিরপুর ডিওএইচএস মাঠসহ প্রায় ২০০টি স্থান অনুমোদিত, দেশের অন্যান্য শহর ও গ্রামেও ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় কর্তৃপক্ষ থেকে নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করা হয়। তবে অনেক সময় অনুমোদিত স্থান ব্যবহার না করে কোরবানী হওয়ায় বর্জ্য অপসারণ ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে নানা সমস্যা দেখা দেয়। ২০২৪ সালের ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ৫৪ ওয়ার্ডে ১০,০০০ কর্মী নিয়োগ করে ছয় ঘণ্টার মধ্যে পশুর বর্জ্য অপসারণ করেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনও ৬৪ ওয়ার্ডের (৮৩%) বর্জ্য রাত ৮টার মধ্যে অপসারণের দাবি করেছে। কিন্তু দেশের অনেক অংশে, বিশেষ করে শহরগুলোর বাইরের এলাকায় বর্জ্য অপসারণ এখনো অপর্যাপ্ত এবং অনিয়মিত। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে নদী ও ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হচ্ছে, বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা নদী। বর্জ্যের পচনের সময় ক্ষতিকর গ্যাস ও দুর্গন্ধ ছড়ায় যা শ্বাসকষ্ট ও পরিবেশ দূষণ বাড়ায়। জমে থাকা পানি মশার প্রজনন বাড়িয়ে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া এই বর্জ্যের কারণে মাটির উর্বরতা কমে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অপরিকল্পিত বর্জ্যের ফলে ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ে। বিভিন্ন জীবাণু যেমন ই-কোলি, স্যালমোনেলা ও ক্রিপ্টোস্পোরিডিয়াম এই বর্জ্যে সক্রিয় থাকে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। এছাড়া, কোরবানীর সময় মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার (পিপিই) সীমিত। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৩০% মাংস প্রক্রিয়াজাতকারি কর্মী মাস্ক ব্যবহার করেন এবং মাত্র ১৪% ক্যাপ পরিধান করেন, যা জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তায় মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি করে। ঈদুল আযহায় দেশের বার্ষিক কাঁচা চামড়ার ৪০-৫০% সরবরাহ হয়। চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় লবণ ও সংরক্ষণ সুবিধার অপর্যাপ্ততার কারণে প্রতি বছর ১০-২০% চামড়া নষ্ট হয়। অধিকাংশ লেদার উৎপাদনে ব্যবহৃত ক্রোম ট্যানিং, পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম কারণ। ট্যানারি শ্রমিকরা বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসে শ্বাসকষ্ট ও ত্বক সমস্যায় ভুগেন। ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি শিল্পের স্থানান্তরের পরও নদী দূষণ ও শ্রমিক সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ অমীমাংসিত রয়েছে। এই সকল সমস্যা মোকাবিলায় এবং কোরবানীকে যথাযথ ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে পালন এবং জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার প্রয়োজন অপরিহার্য। ‘ওয়ান হেলথ’ হলো মানব, প্রাণি ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একত্রিত করে এমন একটি সমন্বিত পদ্ধতি, যা নিশ্চিত করে যে প্রতিটি ক্ষেত্র সুরক্ষিত ও সুস্থ থাকবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কোরবানীর সময় প্রাণিকল্যাণ, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষা করা ও বাস্তবায়ন করা এখন একটি বৈশ্বিক দাবী। কোরবানীর পশুর স্বাস্থ্যকর পরিবহন ও প্রাণিচিকিৎসা, নির্ধারিত স্থানে নিরাপদ কোরবানী, যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সুরক্ষা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, ধর্মীয় নেতা, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ খামারী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে যাতে কোরবানীর এই মহৎ উৎসবটি নিরাপদ ও সুন্দর হয়। ‘ওয়ান হেলথ’
ধারণার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা শুধু কোরবানীর ধর্মীয় ও সামাজিক মাহাত্ম্যই রক্ষা করবো না, বরং দেশের স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং প্রাণিকুলের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবো।
একত্রিত প্রচেষ্টা ও সচেতনতার মাধ্যমে কোরবানীর মহিমা, সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ সমাজ ও বাসযোগ্য সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা
সম্ভবপর হবে।
অধ্যাপক মোঃ আহসানুল হক (রোকন)
মেডিসিন ও সার্জারি বিভাগ, ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ
পরিচালক, ওয়ান হেলথ্ ইন্সটিটিউট
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু)
মোবাইলঃ +৮৮০১৭৫৭৭৯৬৮৬৬
সম্পাদক : এসএম শামসুল আলম।
ফোন:- ০১৫৫০৬০৯৩০৬, ০১৮২৮৯৫২৬২৬ ইমেইল:- smshamsul.cht@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Chtnews24.com