সোমবার, ২৮ মে ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

বৃহস্পতিবার, ১৭ মে, ২০১৮, ০১:১৬:০৮

ভারতের মিজোরামের সীমান্ত ঘেঁষা ঠেগামুখঃ সৌহার্দ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে অটুট

ভারতের মিজোরামের সীমান্ত ঘেঁষা ঠেগামুখঃ সৌহার্দ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে অটুট

পর্যটন ডেস্কঃ-রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার ঠেগামুখ বা থেগামুখ বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষা জনপদ। জনপদ বলতে. কেবল একটি বাজার। রয়েছে পাহাড়ি বিশেষ করে চাকমা জাতিগোষ্ঠীর বসতবাড়ি।
পাহাড় থেকে বয়ে আসা ঠেগা ছড়া। এখানে এসে কর্ণফুলিতে মিলিত হয়েছে। তাই ছড়ার নামেই ঠেগার নামকরণ।
ভারতের মিজোরামের সীমান্ত ঘেঁষা ঠেগা হয়ে বয়ে আসে কর্ণফুলির মূল স্রোত। মিজোরামের ব্লু মাউন্টেইন বা নীল পাহাড়ের (লুসাই পাহাড়) স্রোতধারা এসে মিশেছে বাংলাদেশের ঠেগামুখ সীমান্তে।
নদীর দুপাশে, সীমান্তে, দুই দেশেই চাকমা জাতিগোষ্ঠীর বসতি। তাই সৌহার্দ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট। ছোট কর্ণফুলীর দূরত্ব এখানে বাধা হতে পারেনি।
ছোট হরিণা থেকে ঠেগামুখ সীমান্তে তেমন কড়াকড়ি নেই। সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফ পারস্পরিক সৌহাদ্য ও বন্ধুত্ব রয়েছে। ছোট হরিণা থেকে ঠেগামুখ সীমান্তে বিজিবি'র মাধ্যমে চলছে সীমান্ত সুরক্ষা। বড়হরিণা, মরা থেগা, থেগাসহ একাধিক সীমান্ত চৌকিতে বিজিবি জোয়ানদের উপস্থিতি লক্ষ্য করার মতো। দিন-রাত ২৪ ঘন্টা টহল চলে এখানকার সীমান্ত পাহারা। কর্ণফুলির উজান নদীর মাঝ বরাবর ‘শূন্য রেখা’। ভারত-বাংলাদেশের পতাকাবাহী নৌকা চলছে নদীর পথে। বছরের পর বছর ধরে এখানে দু’দেশের মানুষ সীমান্তের বসবাস করছে। তবে ছোট হরিণার পর নিরাপত্তার জন্য বাঙালিদের চলাচল করার অনুমতি নেই।
ছোট হরিণা থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে ঠেগামুখ সীমান্ত। সীমান্তের পাশেই ঠেগামুখ বাজার এবং ঠেগামুখ বিওপি। পরিপাটি ঠেগামুখ ক্যাম্প। গত বছর জুন মাসে ভয়াল স্রোতে ভেসে গিয়েছিল ঠেগা মুখ ক্যাম্পের গোলঘর। পরে তা সংস্কার করা হয়। ক্যাম্পের গোলঘর থেকে বসেই চোখে পড়ে মিজোরামের নীল পাহাড়, মিজো গ্রাম আর সবুজ দৃশ্যপট।
বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় নৌ বন্দরের তালিকায় রয়েছে ঠেগামুখ। রয়েছে ঠেগামুখের বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। হৃদ আর ছোট পাহাড়ের ঘেঁষা রাঙ্গামাটি। যার বেশ বড় অংশ জুড়ে সংরক্ষিত বন, অনাবিষ্কৃত ঝরনা, অদেখা পাহাড় এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি মানুষের বসবাস। ঠেগামুখের গন্তব্য এবারের রৌদ্র ঝলমল দিনের হাত ধরে।
‘কান্ট্রি বোট’য়ের ইঞ্জিনের খটখট শব্দে নিরন্তর চলা। জলের দুপাশে সাজানো দৃশ্যের চেয়ে বেশি কিছু। হৃদের সবুজাভ জলের রং আগের দিনের বৃষ্টিতে কিছুটা ম্লান হয়েছে।
রাঙ্গামাটি থেকে শুভলংয়ের বিরতি শেষ করে সরাসরি বরকল যাত্রা। রাঙ্গামাটি থেকে ছোট হরিণা পর্যন্ত ৭৬ কি.লি জলের পথ। এই পথে কেবল অচেনা পাখি, পাহাড় আর জলের মিলনের সুর। বরকল বাজার থেকে ছোট হরিণার পথে রওনা দিতে বিকেল প্রায় ছুঁই ছুঁই। এর আগে লংগদু হয়ে আমাদের যাত্রা হত শুভলং বাজার। সেখান থেকে দুপুর আড়াইটায় বরকলের শেষ লঞ্চ ধরতে হত। বরকল হয়ে হরিণা যেতে সময় লাগবে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। লেকের পানি কমে যাওয়ায় রাঙ্গামাটি থেকেই সরাসরি কান্ট্রি বোটে বরকলের উদ্দেশ্যে চলা।
ক্লান্তিহীন প্রায় ১০ ঘণ্টার ভ্রমণ। কাপ্তাই লেকের কোল ঘেঁষে থাকা পাহাড়, দলছুট বাড়ি, নীল জলরাশির ভীড়ে কোথাও কোথাও পাখির ঝাঁক। বরকলের পাহাড় চূড়ায় সূযর্টা কত সুন্দর হতে পারে! সেই সঙ্গে শেষ বিকেলের মায়াবী আলোয়। বরকল বাজার পাড়ি দিতে না দিতেই চোখ ধাঁধাঁনো সব দৃশ্যপট।
পাহাড়ের কোলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ঐতিহ্যবাহী  জুম ঘর। মেঘের ছায়ায় ঢেকে আছে গ্রামগুলো। কাশবন ঘেঁষা পাহাড়ের কোলজুড়ে রংধনুর রেখা, সবুজ পাহাড়কে যেন আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। শেষ বিকেলের শান্ত জলপথ। সন্ধ্যার সোনালি উজ্জ্বল আকাশ! এ যেন পূর্ণিমার আলোয় ডুবে থাকা নীরব-নিঝুম পাহাড়। কর্ণফুলির দুধারে এমন নিরবিচ্ছিন্ন পাহাড়ের সারি আর কোথাও বোধহয় পাওয়া যাবে না। তবে লেকের পানি কম হওয়ায় কোথাও কোথাও আটকে যায় বোটের তলা।
শেষ বিকেলে ছোট হরিণার আগেই ভূষণ ছড়ায় নামতে হল। পানি কম হওয়ায় ওদিকটায় যাওয়া সম্ভব হবে না। ভূষণ ছড়ায় নেমে ভাড়া চালিত বাইকে ছোট হরিণা ঘাট। তারপর নৌকায় পার হলেই ছোট হরিণা বাজার। নেমেই ক্যাম্পে ছোট হরিণা বিজিবি জোন অধিনায়কের আমন্ত্রণে চা আর ঝাল খাবারে আয়োজন সামিল হয়েছি।
ক্যাম্পের ভেতরে বাঁশ দিয়ে সাজানো দারুণ শৈলির বৈঠকখানা। সেই দীর্ঘ নৌযাত্রার পর অসাধারণ সন্ধ্যার ভোজ। এত দুর্গমেও অসাধারণ খাবারের স্বাদ।
ক্যাম্প থেকে বিদায় নিয়ে বাজার দিকে রওনা হলাম আমাদের রাতের থাকার জায়গা। পাহাড় আর নদী ঘেঁষা ছোট হরিণা বাজার। ধবধবে জোঁছনায় আলোকিত পুরো সীমান্ত। নদীর জলে ধুয়ে যাচ্ছে চাঁদের আলো। কি মুগ্ধ করা রাত! পাহাড় ঘেঁষে থাকা চাঁদের আলোয় রূপালি জলের ধারা। তীব্র স্রোতে ভেসে যাওয়ার এই তো সময়।
পরদিন সকাল হতেই ঠেগামুখে যাওয়ার প্রস্তুতি। যাত্রার সঙ্গী বিশেষ ইঞ্জিন চালিত বার্মিজ বোট। দেশি বোটের চেয়ে এর গতি অনেক বেশি। তীব্র স্রোতের বিপরীতে ছুটে চলে বার্মিজ বোট। সামনে যেতেই সুউচ্চ টারশিয়ান যুগের পাহাড়। শান্ত জলের ধারায় ছুটে চলা বার্মিজ বোটে।
পাহাড়ে ভাঁজে ভাঁজে পাহাড়িদের বসতি। বড় হরিণা ক্যাম্পে ক্ষণিকের বিরতি। ক্যাম্পের উল্টোদিকে জিরা’র খামার। প্রায় এক ঘণ্টা চলার পর দেখা মেলে মিজোরাম সীমান্ত।
বিএসএফ এর নিরাপত্তা চৌকি। সুদূরে উঁচু পাহাড়ের সীমানা। পথে পথে মিজোদের যাতায়াত। কর্ণফুলির পাড় ঘেঁষে অচেনা মিজো গ্রামের নান্দনিক বসতবাড়ি। ওপারে সীমান্তে মেলে নাগরিক জীবনের সকল সুবিধা। মিজোরামে পাকা সড়ক, বিদ্যুৎ সবই আছে। কোথাও কোথাও ভারতীয় পতাকাবাহী নৌকায় মিজোদের যাতায়াত।
শনিবার মিজোরামের সীমান্ত ঘেঁষা শিলচর বাজার হওয়ায় বাজার থেকে সদাই করে ফিরছে ওরা। শুধু মিজোরায় নয় শিলচর হাঁটে বাংলাদেশ থেকে পাহাড়িরাও যায়। আবার বাজার শেষ করে ঠেগামুখে ফিরে আসে। ওপার থেকে মিজোগ্রামের বাসিন্দারাও এপার (ঠেগামুখ) থেকে বাজার করে নিয়ে যায়। মাঝখানে কেবল একটি নদীর দূরত্ব।
ঠেগামুখ বাজারে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘন্টা। বাজারটা সরকারিকরণ হয় ২০০৩ সালে। সব মিলিয়ে ১৫-২০টি দোকান। সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার বাজার বসে। সেদিন দূর-দূরান্তের বাসিন্দারা বাজারে এসে মিলিত হয়। দুই দেশের মানুষের উপস্থিতিতে সরগরম থাকে বাজার।
দোকানদার রুমা চাকমা (৩২) জানান, আট বছর ধরে এখানে দোকান করছি। ভালোই বেঁচাকেনা হয়। সীমান্ত কাছের হওয়ায় বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য থাকে।
আরও বলেন, দুই পাড়ের মানুষের সাথে আত্মীয়তার সর্ম্পক রয়েছে। ঠেগামুখ বাজারে নিত্য পণ্য কিনে আবার ফিরে যাচ্ছে মিজোরামে নাগরিকেরা। বছরে পর বছর এখানে এভাবে চলে লেনদেন।
দীর্ঘ সময় ঠেগামুখ বাজারে কাটিয়ে আবার রওনা হলাম ছোট হরিণার পথে। হরিণা ক্যাম্পে সিও’র আমন্ত্রণে দুপুরের উদরপূর্তি। নদীর বোয়াল, কাতালসহ বিভিন্ন উপদেয় খাবার মধ্যহ্নভোজ শেষে বিকেলের মায়াবী আলোয় কর্ণফুলির নদীর স্রোতে ভেসে চলা। দিন শেষে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নেমে যাচ্ছে শেষ বিকেলের সূর্য। তার পূর্বকাশে পাহাড়ে হেলান দিয়েছে পূর্ণিমার ঝকঝকে বড় চাঁদ। চাঁদের আলোয় ডুবে থাকে চিত্রপটের মতোই সুন্দর হরিণা, শ্রীনগর, নীলকন্ঠ, মিজোরামের পাহাড় এবং ঠেগামুখ।
প্রয়োজনীয় তথ্যঃ
জলযানে রাঙ্গমাটি থেকে বরকল। সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। বরকল থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার পথ ছোট হরিণা। তবে নদীতে পানি কমে যাওয়ায় সময় আরও বেশি লাগতে পারে।
ছোট হরিণার থাকার তেমন ভালো আয়োজন নেই। থাকতে হবে দোতলা বোর্ডিংয়ে। শৌচাগারের সুবিধা নেই। তবে খাবারের ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। বাজারের বাথুয়ায় রাখাইনে খাবারের ষোলোয়ানা বাঙালি স্বাদ পাওয়া যায়। তবে ঠেগামুখ যাওয়ার আপাতত অনুমতি নেই। বিশেষ উপায়ে অনুমতি মিললে যেতে পারবেন। বার্মিজ বোটে সময় লাগবে দুই ঘন্টা।

এই বিভাগের আরও খবর

  ভারতের মিজোরামের সীমান্ত ঘেঁষা ঠেগামুখঃ সৌহার্দ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে অটুট

  রাজস্থলীতে পর্যটন সম্ভাবনাময় দর্শনীয় স্থানগুলো অবহেলিত

  নতুন রূপে নতুন আকর্ষনেকাপ্তাই প্রশান্তি পিকনিক স্পট

  সাইরু ম্রোর অমর প্রেম কাহিনী ‘বন্ধু ছাড়া বাঁচি কি করে’

  লেক প্যারাডাইস পিকনিক স্পট কাপ্তাইয়ের অন্যতম আকর্ষনীয় বিনোদন কেন্দ্র

  বান্দরবানের মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে পরিচ্ছন্নতা অভিযান

  পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় পানছড়ির লেক ‘মায়াবিনী’

  খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় ভ্রমন পিপাসুদের নতুন মাত্রা ভগবান টিলা

  প্রতিদিনই পর্যটকদের ভ্রমনের নিরাপত্তা, আবাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে জেলা প্রশাসনের নজরদারি রয়েছে-দিলীপ কুমার বণিক

  বান্দরবানে জেলা প্রশাসন কর্তৃক পরিচালিত মেঘলা ও নীলাচলে পর্যটক অবস্থানের সময় বাড়লো

  চার মাস পর পর্যটকদের জন্য খুলে দেয়া হলো রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত সেতু

 

 

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কাজ হচ্ছে, এখানে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। বাস্তবে তা ঘটবে বলে মনে করেন?