Chtnews24.com
আগস্টে আরো ভয়ংকর রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু
Tuesday, 06 Aug 2019 13:55 pm
Reporter :
Chtnews24.com

Chtnews24.com

ডেক্স রিপের্টঃ-চলতি আগস্ট মাসে আরো ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু। পুরো জুলাই মাসে সারা দেশে ১৬ হাজার ২২৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসাপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। আর অগাস্ট মাসের প্রথম ৫ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৯৮৩ জন ডেঙ্গু রোগী। এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০৬৫ জন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ৮৬ জনেরও বেশি নারী, পুরুষ ও শিশু ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন।
গতকাল মারা গেছেন আবহাওয়াবিদের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীসহ ৭ জন। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় চিকিত্সা সেবা নিয়ে টেনশনে রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এমনিতে সরকারি হাসপাতাল-গুলোতে চাহিদার তিন গুন চিকিত্সক সংকট। তার ওপর ডেঙ্গু রোগীর ভয়াবহ চাপ। এডিস মশার প্রকোপ না কমলে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপও কমবে না বলেও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তারা বলেন, হাসপাতালে পরীক্ষা করতে আসা ৬০ ভাগ রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত নন। এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় ব্যবহারের জন্য মশার ওষুধের নমুনা বিদেশ থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছেছে। সোমবার দুপুরে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে নমুনাগুলো ঢাকায় এসে পৌঁছায়।
কলকাতার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ ডেঙ্গু প্রতিরোধে কীটনাশক প্রয়োগের চেয়ে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার উত্পত্তিস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সোমবার দুপুর পৌণে তিনটায় রাজধানীর গুলশানস্থ নগর ভবনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি এ গুরুত্ব আরোপ করেন। কলকাতা থেকে তিনি ভিডিও কনফারেন্সে বলেন, কলকাতা পৌরসভা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে প্রতিরোধ ও প্রতিকার এ দু’টি ভাগে বিভক্ত করেছে। কলকাতা পৌরসভা ২০০৯ সাল থেকে ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণে তিন স্তর বিশিষ্ট মনিটরিং চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়ার্ড, বরো ও হেড কোয়ার্টার এ তিন পর্যায়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কলকাতায় সারা বছর ধরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মনিটরিং এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় বলেও তিনি জানান। অতীন ঘোষ বলেন, ‘মশারে করো উেস বিনাশ’ এই স্লোগান নিয়ে বাসা-বাড়ি কিংবা উন্মুক্ত জলাশয় যেখানেই এডিস মশার প্রজননস্থল পাওয়া যায়, তা ধ্বংস করা হয়। ঢাকার কোন কোন এলাকা ডেঙ্গু প্রবণ তা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ি ব্যবস্থা গ্রহণেরও পরামর্শ দেন তিনি। অতীন ঘোষ বলেন, প্রয়োজন ভিত্তিক কৌশলী হতে হবে। কলকাতা পৌরসভা ৯ বছর যাবত অবকাঠামোভিত্তিক লড়াই চালিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিনি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন। কলকাতার ডেপুটি মেয়র জানান, কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে ফগার মেশিনের সাহায্যে ধোঁয়া প্রয়োগ কার্যকরী হলেও এডিস মশা দমনে এর কার্যকারিতা কম। এডিস মশা দমনে উেস নির্মূল করা এবং জনসচেতনতা তৈরি করারও বিকল্প নেই বলে অতীন ঘোষ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের লক্ষ্যে আইন পরিবর্ধন করে শাস্তির পরিমান বাড়ানো হয়েছে। ফলে মানুষ আগের চেয়ে অনেক সচেতন। ডিএনসিসি মেয়র কলকাতার ডেপুটি মেয়রকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আজকের এই কনফারেন্স থেকে আমাদের অনেক ‘নলেজ শেয়ারিং’ হলো। কলকাতার অভিজ্ঞতা আমরা কাজে লাগাতে পারবো। কলকাতার সঙ্গে এ ধরণের ‘নলেজ শেয়ারিং’ এটি প্রথম হলেও শেষ নয়। ভবিষ্যতে দুই শহরের যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক মো. খলিলুর রহমান, ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল হাই, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান মামুন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার, কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী, কলকাতা পৌরসভার চিফ ভেক্টর কন্ট্রোল অফিসার ডা. দেবাশীষ বিশ্বাস, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মনিরুল ইসলাম, উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুব্রত রায় চৌধুরী, স্বাস্থ্য বিষয়ক মূখ্য পরামর্শক ডা. তপন মুখার্জী প্রমূখ ভিডিও কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম জানিয়েছে, রবিবার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে মোট ২০৬৫ জন ডেঙ্গু নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন। মাঝে দুদিন নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা কিছুটা কমলেও রবিবার থেকে এই ধারা আবার বাড়তির দিকে যায়। শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট ১৭১২ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ডেঙ্গু আতঙ্ক ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। এই রোগ পরীক্ষার হিড়িক পড়ায় ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিটের সংকট দেখা দিয়েছে সারাদেশে, দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। কোনো কোনো বেসরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অবস্থায় রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুরোধ করা হয়েছে চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া ডেঙ্গুর পরীক্ষা না করাতে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত মোট ২৭ হাজার ৪৩৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৯ হাজার ৭৬১ জন চিকিত্সা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। মোট ৭ হাজার ৬৫৮ জন এখনো চিকিত্সাধীন। এর মধ্যে রাজধানীর ৩৮টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৪ হাজার ৯৬২ জন ডেঙ্গু রোগী। আর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় ভর্তি আছেন ২ হাজার ৬৯৬ জন।
২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হওয়া ২০৬৫ জন নতুন রোগীর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ১৫৯ জন এবং রাজধানীর বাইরে সারা দেশে ৯০৬ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৮৭০ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন, তাদের মধ্যে রাজধানীতে এক হাজার ৫৩ জন এবং রাজধানীর বাইরে সারা দেশে ৮২১ জন। অর্থাত্, ঢাকার পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এসব জেলার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ২২১ জন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮০ জন, খুলনা বিভাগে ১৫০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১১২ জন, বরিশাল বিভাগে ৯৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬১ জন, রংপুর বিভাগে ৪৭ জন এবং সিলেট বিভাগে ৩৬ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে।
ডেঙ্গুতে আরো ৬ জন মারা গেছেনঃ
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গতকাল ঢাকা, মাদারীপুর, খুলনা, কুমিল্লা ও রংপুরের মিঠাপুকুরে মোট ৭ জন মারা গেছেন। এদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা এক নারী ও ১৩ বছরের এক শিশু রয়েছে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার আবহাওয়াবিদ নাজমুল হকের স্ত্রী শারমিন আক্তার (৩২) নামে ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারী মারা গেছেন। সোমবার ভোরে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাসান (১৩) নামে এক কিশোর মারা গেছে। এ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ পর্যন্ত ১৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রিপন হাওলাদার (৩০) মারা গেছেন। খুলনায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে খাদিজা বেগম (৪০) মারা গেছেন। সোমবার সকালে খুলনা নগরীর সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। রংপুরের মিঠাপুকুরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৪ বছর বয়সী এক শিশু মারা গেছে। তার নাম তিষা মণি।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে পাবনার শিশু নাইসা (৫ মাস)। এদিকে গতকাল ঢাকার শনির আখড়ার বাসিন্দা নকুল কুমার দাস (৪৫) নামে একজন মারা গেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ অযথা আতঙ্কিত হয়ে ডেঙ্গু টেস্ট না করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় প্রয়োজন। অকারণে চাপ বাড়ালে যারা সত্যিই খুব অসুস্থ, তাদের সেবায় বিঘ্ন ঘটবে। এজন্য অযথা আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে টেস্ট করতে হবে। গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি একথা বলেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, চিকিৎসকরা বিরামহীনভাবে ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে অনেকে সর্দি জ্বর ও সাধারণ জ্বর নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। বাংলাদেশে যারা মারা গেছেন, তারা শুধু ডেঙ্গু জ্বরে নয়, তাদের হার্ট, কিডনি, ডায়াবেটিকস, উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য রোগ ছিল বলে তিনি জানান।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসকরা এখন অভিজ্ঞ হয়ে গেছেন। তবে যে হারে ডেঙ্গু রোগী আসা অব্যাহত আছে, তাতে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কতোটা সামাল দিতে পারবো তা জানি না। তিনি বলেন, তার কাছে আসা রোগীদের ৭৫ ভাগেরই ডেঙ্গু হয়নি।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তর কুমার বড়ুয়া বলেন, প্রচন্ড রোগীর চাপে এ হাসপাতালে ৭ জন ডাক্তার ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আবার তিন জনের ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। দুই জন নার্সও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত। এভাবে ডেঙ্গু রোগী আসা অব্যাহত থাকলে সেবা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সি বলেন, এ হাসপাতালে পরীক্ষা করতে আসা ৫০ ভাগ রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত নন। সাধারণ জ্বর নিয়ে অনেক হাসপাতালে আসছেন।
সম্প্রতি সারাদেশে বেড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। তাই কম খরচে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে ডেঙ্গু টেস্ট কিট, ডেঙ্গু রি-এজেন্ট ও প্লাটিলেট অ্যান্ড প্লাজমা আমদানিতে শুল্ক, ভ্যাট, আগাম কর এবং অগ্রিম আয়কর অব্যাহতি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই সুবিধা আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বহাল থাকবে।