রবিবার, ১৭ অক্টোবর ,২০২১

Bangla Version
  
SHARE

সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ০৩:৩৯:১৬

ঘাতকব্যাধি হৃদরোগ প্রতিরোধের উপায়

ঘাতকব্যাধি হৃদরোগ প্রতিরোধের উপায়

ডা. মাহবুবর রহমান:- আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর বুধবার বিশ্ব হার্ট দিবস। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হবে এ দিনটি। গত ১৮ মাসে ভয়াবহ কভিডে সারা বিশ্ব হারিয়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের জীবন। আর গত ১৮ মাসে হৃদরোগ ও রক্তনালির রোগে বিশ্ব হারিয়েছে ২ কোটি ৭৯ লাখ মানুষের জীবন। কার্ডিওভাসকুলার রোগের এই নীরব মহামারীর আঘাত প্রায়ই আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। হৃদরোগের ক্ষেত্রে ঘটনার ঘনঘটা দৃশ্যমান হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত হৃদরোগ ও রক্তনালীর জটিলতায় সবচেয়ে বেশি (সব মৃত্যুর ৩১%) মানুষ মারা যায়। প্রতি বছর সারা বিশ্বে ৫২ কোটি মানুষ এ রোগে ভুগছে। গত এক বছরে বাংলাদেশে ১ লাখ ১২ হাজার মৃত্যুর ৪০ হাজারই মারা গেছে হৃদরোগ ও রক্তনালির জটিলতায়। প্রতিরোধের উপায় কী? প্রথমেই বলে রাখি, হৃদরোগ সংক্রান্ত জটিলতা শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য। বাকি ২০ ভাগ চিকিৎসাযোগ্য কিন্তু ব্যয়বহুল। আক্রান্ত হলে জীবনের কর্মক্ষমতা, শরীরের উৎপাদনক্ষমতা উল্লেখযোগ্যহারে কমিয়ে দেয়। তাহলে যেটি ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য সেদিকেই মনোযোগ দিতে হবে সবার আগে। সবার আগে সচেতন সংকল্প সবার আগে আপনাকে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে, আপনি এই রোগকে প্রতিরোধ করতে চান কিনা। আপনার মাইন্ডসেট পরিবর্তন করুন। দায়সারা গোছের সিদ্ধান্ত চাই না। দৃঢ় সংকল্প করুন। আগামীকাল থেকে নয়, আজকে থেকেও নয়। এখন থেকে করুন। আপনি প্রস্তুত? যদি হ্যাঁ হয়, তবে আপনার কাজ ইতিমধ্যে ৫০% হয়ে গেল! বাকি ৩০% অর্জনে কী কী করবেন? ওজন কমান, ব্যায়াম করুন : শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে ফেলুন। গুগল সার্চ করে জেনে নিন আপনার উচ্চতায় আদর্শ ওজন কত হওয়া উচিত। উচ্চতা আর ওজনের অনুপাত করে নড়ফু সধংং রহফবী বা ইগও বের করে নিন। (দেখুন Google BMI Calculator)। আমাদের আদর্শ BMI হলো ১৯ থেকে ২৪.৯। এর নিচে হলে কম ওজন আর ২৫ থেকে ৩০ পর্যন্ত হলো স্থূলতা বা obesity, ৩০-এর বেশি হলে বলি মারাত্মক স্থূলতা (বা morbid obesit)। ওজন বাড়ানো কঠিন কাজ নয়। কোনো রোগ না থাকলে খাদ্য গ্রহণ বাড়ালেই ওজন বেড়ে যাবে। মূলত সমস্যা হলো ওজন কমানো। ওজন কমানোর দুটি উপায় আছে- ক) প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো শর্করা জাতীয় খাবার নিয়ন্ত্রণ করা। ভাত, আলু, চিনি, মিষ্টি, মিষ্টান্ন, চাল ইত্যাদি যাবতীয় খাবার কমিয়ে দিতে হবে। পরিমাণ মতো চর্বি, পর্যাপ্ত মাছ, সাদা মাংস (মুরগি), কুসুমসহ একটি ডিম, ইচ্ছে মতো শাকসবজি, সালাদ, পরিমিত তাজা ফল এবং কমপক্ষে দুই লিটার পানি খেতে পারবেন। খ) ওজন কমানোর দ্বিতীয় কিন্তু কম কার্যকর পদ্ধতি হলো নিয়মিত ব্যায়াম করা। খোলা জায়গায় সপ্তাহে কমপক্ষে ৫ দিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট জোরে জোরে হাঁটবেন যাতে শরীরে ঘাম ঝরে পড়ে এবং হার্টবিট ১২০ পর্যন্ত ওঠে। শুধু হাঁটাচলা বা ব্যায়ামে ওজন তেমন একটা না কমলেও তা হৃদপিণ্ড এবং রক্তনালিকে সতেজ রাখে, ব্লকমুক্ত রাখে, প্রেসার ও ডায়াবেটিস কমায়, কোলেস্টেরল কমায় এবং মনকে সতেজ রাখে। উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করুন উচ্চরক্তচাপ বা হাই প্রেসার হলো এক নীরব ঘাতক। নীরব এজন্য যে, ৯০% ক্ষেত্রে সে কোনো উপসর্গ বা কষ্ট দেয় না। অনেক রোগী ২০০/১০০ প্রেসার নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যেহেতু তার কোনো কষ্ট হচ্ছে না তাই চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হচ্ছেন না। অন্য কোনো কারণে চেকআপের সময় প্রেসার ধরা পড়লেও রোগী সেটা তত গুরুত্ব সহকারে নিতে চান না। অনেকে ওষুধ শুরু করলেও পরে তা ছেড়ে দেন। কারণ হাই প্রেসারে তার তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না! মনে রাখতে হবে উচ্চ রক্তচাপ ক্রমাগত বহাল থাকলে তা হার্ট, কিডনি, ব্রেন, চোখের রেটিনা এবং পায়ের রক্তনালিসহ সারা শরীরের ক্ষতি করবে। যখন উপসর্গ দেখা দিবে তখন দেখা গেল ওই সব অঙ্গ ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তাই উপসর্গের অপেক্ষায় না থেকে হাই প্রেসারের চিকিৎসা করুন। নিজে নিজে ওষুধ বন্ধ করবেন না। ওষুধে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করুন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করুন বয়স ৩০ হলেই ডায়াবেটিস চেক করুন। বছরে একবার চেক করুন। একটা স্যাম্পলে অনেক সময় প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। তাই কমপক্ষে দুটো স্যাম্পল (যেমন নাশতার ২ ঘণ্টা পরের সুগার এবং তিন মাসের গড় সুগার জানতে HbA1C) পরীক্ষা করুন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই টেস্টই যথেষ্ট। ডায়াবেটিস হলে কী করবেন? ডায়াবেটিস মেটাবলিক কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ। অর্থ হলো এটি শুধু মেটাবলিক বা হরমোনাল সমস্যা নয়। এটি শরীরের সব রক্তনালিকে আক্রান্ত করে। তাই হার্টের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। এর গুরুত্ব তাই অনেক বেশি। ডায়াবেটিসের মাত্রার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসার ধরন। তবে প্রথম ধাপ হলো ডায়েট এবং ব্যায়াম। এ পদ্ধতিতে সুগার নিয়ন্ত্রণ না হলে ওষুধ প্রয়োজন হয়। প্রথমে খাবার বড়ি তারপর ইনসুলিন। সুগার কত রাখবেন? খালি পেটে ৬ থেকে ৭ এবং খাবার দুই ঘণ্টা পর ৭ থেকে ৯, তবে কোনোভাবে ১০-এর উপরে নয়। তিন মাসের গড় HbA1C অবশ্যই ৭-এর মধ্যে রাখার চেষ্টা করতে হবে। ধূমপানসহ তামাকজাত দ্রব্য পরিবার যে কোনো তামাক, জর্দা, গুল, বিড়ি, সিগারেট বর্জন করুন। তামাক শুধু হৃদরোগ, স্ট্রোক সৃষ্টি করে না; নানান ক্যান্সার, ব্রঙ্কাইটিস ইত্যাদির কারণও সে। এছাড়া এলকোহল ছেড়ে দিন। এটি প্রেসার বাড়ায়। রক্তের চর্বি ট্রাইগ্লিসারাইড বৃদ্ধি করে হার্ট অ্যাটাক, প্যানক্রিয়াটাইটিসসহ নানা অপকর্ম ঘটায়। কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করুন অনেকে হাই কোলেস্টেরলের ওষুধ শুরু করে কিছুদিন পর নিজে নিজে বন্ধ করে দেন। এমনকি কোনো কোনো ডাক্তার সাহেবকেও দেখেছি বুঝে না বুঝে চর্বির ওষুধ বন্ধ করে দেন। এটি মারাত্মক একটি ভুল। হাই কোলেস্টেরল নিজেই ডায়াবেটিসের মতো একটি দীর্ঘস্থায়ী, সম্ভবত আজীবন সঙ্গী একটি সমস্যা। রক্তনালিতে ব্লক তৈরির মূল উপাদান হলো চর্বি। তাই সুগার কন্ট্রোল করার মতো চর্বিও সারা জীবন কন্ট্রোল করতে হবে। দুটো ওষুধ কখনো বন্ধ করবেন না যাদের একবার হৃদরোগ, রক্তনালিতে ব্লক ধরা পড়েছে, হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, ব্রেন স্ট্রোক করেছে তারা দুটো ওষুধ সারাজীবন খেয়ে যাবেন। একটি হলো কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ (statin), আর দ্বিতীয়টি হলো রক্ত পাতলা করার ওষুধ (যেমন Aspirin, clopidogrel)। শুধু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে বিশেষ ক্ষেত্রে সাময়িক স্থগিত রাখা যেতে পারে। ডায়াবেটিসে কোলেস্টেরলের ওষুধ যাদের একবার ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে তাদের বয়স চল্লিশ বা বেশি হলে সারাজীবন কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ কমবেশি খেয়ে যেতে হবে। এমনকি রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা যাই থাকুক না কেন অনির্দিষ্টকালের মতো স্ট্যাটিন খেতে হবে। সরাসরি চিকিৎসার অংশ ২০% প্রতিরোধের পালা শেষ হলে বা আগেই আক্রান্ত হয়ে পড়লে যথাযথ চিকিৎসা তো শুরু করতে হবে। সেখানে ইসিজি, ইটিটি, ইকোকার্ডিওগ্রাম, এনজিওগ্রাম, রিং বা এনজিওপ্লাস্টি, ওপেনহার্ট বা বাইপাস সার্জারিসহ নানান ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যাপার চলে আসবে। লেখক : সিনিয়র কনসালটেন্ট, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ধানমণ্ডি। মেইল : mahbubordr@gmail.com

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?