শুক্রবার, ১৮ জুন ,২০২১

Bangla Version
  
SHARE

শনিবার, ২২ মে, ২০২১, ১০:১১:০১

অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩ পুনম আগরওয়াল মামলা

 অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩ পুনম আগরওয়াল মামলা

ড. এম এ মোমেন
আর মাত্র দুই বছর পর ব্রিটিশ আমলে মূলত ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষায় প্রণীত একটি আইন অপ্রয়োজনীয়তার শতবর্ষ উদযাপন করতে যাচ্ছে। অপ্রয়োজনীয়তার ৯৮তম বর্ষে আইনটি সম্ভবত মরার আগে ধপ করে জ্বলে উঠল। পরীক্ষায় টীকা হিসেবে প্রশ্নপত্রে আইনটির নাম থাকতেও পারে, সুতরাং ঠিক ৪০ বছর আগে শানে নুজুলসহ (অর্থাৎ কোন পরিস্থিতিতে আইনটির সৃষ্টি হয়েছে) অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট পড়েছি, পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হয়েছি, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট পদে দায়িত্বও পালন করেছি। আমার সমগ্র চাকরিজীবনে এই আইনের কোনো মামলা দেখিনি। যারা দেখেছেন, দুর্লভ ভাগ্য তাদের। তবে ভারতে এ আইনটির মৌসুমি প্রয়োগ রয়েছে। সেসব মামলা-মোকদ্দমার খবর অভ্যাসজনিত কারণে আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। আর এ ধরনের মামলা না থাকায় বাংলাদেশের তুলনামূলক ম্যাচুরিটিতে সন্তোষ লাভ করেছি। ভারতে এই আইনের অধিকাংশ প্রয়োগই হয়রানিমূলক। আইন প্রণয়নের সময় আইনটি যে অবস্থায় ছিল হুবহু একই অবস্থায় এখন ক্রিকেটের ভাষায় ‘নার্ভাস নাইন্টি’তে এসে পৌঁছেছে। সভ্যতার একটি আইনি সূচক রয়েছে : সভ্যদেশে আইনের সংখ্যা কম কিন্তু প্রয়োগ সুষ্ঠু। যে দেশে ‘অর্ডিন্যান্স’ বানানোর সুযোগ বেশি, সে দেশে আইনের অপপ্রয়োগের আশঙ্কাও তত বেশি।

অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মূল আলোক সম্ভবত তিনটি বিষয়ের ওপর :

১. রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া গুপ্তচরবৃত্তি

২. রাষ্ট্রদ্রোহ

৩. রাষ্ট্রীয় (জাতীয়) অখন্ড তার প্রতি হুমকি।

এই উপাদানের অন্তত একটি তো এই আইনের মামলায় থাকতেই হবে। আর আইনের ধারাগুলোও অস্পষ্ট নয় : যেমন অপরাধমূলক অনুপ্রবেশ বোঝাতে দন্ডবিধিতে অসৎ উদ্দেশ্য এবং অনুপ্রবেশ প্রমাণ করাই যথেষ্ট ছিল; কিন্তু অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করে তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে যেমন রাষ্ট্রের শত্রুকে সরবরাহ করার জন্য স্কেচ ম্যাপ তৈরি করে থাকবেন, সেই ম্যাপসহ মামলায় দাখিল করতে হবে। আমি এ আইনটির অপ্রয়োজনীয়তার শতবর্ষ উদযাপনের কথা বলছি এ কারণে, এতে বর্ণিত প্রতিটি অপরাধই দন্ডবিধিতে অন্তর্ভুক্ত এবং কোনো কোনো অপরাধে মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত শাস্তি হতে পারে। ভারতেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই আইনের অপচর্চাই বেশি হয়েছে।

২০১৭ সালের আলোচিত পুনম আগরওয়াল মামলাটি তুলে ধরছি

রাষ্ট্রের বর্ণনায় ‘আসামি’ পুনম আগরওয়াল একজন সাংবাদিক। তার নিজের ভাষায়, তিনি ‘ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট’ অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বলাই বাহুল্য, অনুসন্ধানী সাংবাদিকের কাজ প্রেস ক্লাবে বসে রাজা-উজির মারা নয়। তিনি কখনো কখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়েই অনুসন্ধান করে সত্য উদঘাটন করেন। এ সত্যই বহুলাংশে রাষ্ট্র ও জনগণকে সুরক্ষা দেয়। আমার বিলেত জীবনের একজন অত্যন্ত প্রিয় অসম সাহসী নারী সাংবাদিক জিল ড্যান্ডো যখন কাজ সেরে নিজের ঘরে ঢুকতে যাচ্ছেন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করেন। পুলিশ তাকে গুলি করেনি, পুলিশ বরং তার কাছে কৃতজ্ঞ ছিল যে তিনি তাদের কাজের সুবিধার জন্য, রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য একটার পর একটা ক্রিমিনাল নেটওয়ার্ক উন্মোচন করে যাচ্ছিলেন। রাজকীয় পুলিশ তাদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছে যে তাকে সুরক্ষা প্রদান করতে পারেনি। পুনম আগরওয়ালের সাংবাদিকতা জীবন শুরু এনডিটিভিতে, পাঁচ বছর কাজ করে এলেন টাইমস নাওতে। ঘটনার সময় ২০১৭ সালে তার কর্মক্ষেত্র মুদ্রণ ওয়েভভিত্তিক দ্য কুইন্ট-এ।

মুম্বাই থেকে ১৭০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে মহারাষ্ট্রের নাসিক শহরের পুলিশ পুনম আগরওয়ালের বিরুদ্ধে ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের দুটি ধারায় গুপ্তচরবৃত্তি ও অপরাধমূলক অনুপ্রবেশের অপরাধ সংঘটনের মামলা দায়ের করে। এর সঙ্গে যোগ করে দন্ডবিধির আরও দুটি ধারার একটি অপরাধমূলক সম্মানহানি এবং অন্যটি আত্মহত্যার প্ররোচনা। যদি সবগুলো অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন এবং পর্যায়ক্রমে তাতে সাজা ভোগ করতে হয়, তাহলে তাকে ২৯ বছর কারাবাস করার কথা। পুনমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি অনুমতি না নিয়ে মহারাষ্ট্রের নাসিক শহরের সেনাছাউনিতে প্রবেশ করেছেন, ভিডিও চিত্র ধারণ করেছেন এবং গোপন ক্যামেরা ও রেকর্ডারে সৈনিকদের সঙ্গে তার কথোপকথন রেকর্ড করেছেন। তিনি এ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে সৈনিকদের চেহারা অসচ্ছ করে দিয়ে তাদের বক্তব্যসহ প্রতিবেদন প্রচার করেছেন।

সৈনিকদের অভিযোগ ছিল, সেনা কর্মকর্তারা তাদের অধীন সৈনিকদের অন্যায়ভাবে ব্যক্তিগত কাজে খাটান এবং তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।

অভিযোগটি যে মিথ্যা নয়, তার বড় প্রমাণ সরকার অধস্তনদের ব্যক্তিগত কাজে যেন ব্যবহার না করে, সে সম্পর্কে আগেই ফরমান জারি করে রেখেছিল। পুনমের ক্যামেরায় এ ধরনের কিছু ব্যক্তিগত কাজ করাকালীন চিত্র ধারণ করা হয়েছে।

পুনমের ধারণ করা ভিডিও একালের ভাষায় ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিও সম্প্রচারের দুই সপ্তাহ পরে তিনি যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তাদের একজন ল্যান্স নায়েক রয় ম্যাথু আকস্মিকভাবে নিরুদ্দিষ্ট হয়ে যান এবং ৭ মার্চ ২০১৭ দিওলালি ছাউনির একটি পরিত্যক্ত ব্যারাকে তিনি ফাঁসিতে ঝুলন্ত অবস্থায় আবিষ্কৃত হন। পুনম আগরওয়ালকে সেনাছাউনিতে সহায়তা করেন সাবেক জওয়ান কারগিল যুদ্ধে তিনটি অঙ্গ হারানো দ্বীপচাঁদ সিংহ। অপর একজন সৈনিককে দিয়ে কর্মকর্তারা নাসিক পুলিশের কাছে মামলা করান। তাতে রয় ম্যাথুর আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী হিসেবে ভারতীয় পেনাল কোডের ধারা এবং অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের গুপ্তচরবৃত্তি (ধারা ৩) সৈনিকদের কাজে হস্তক্ষেপ (ধারা ৭) এবং সংরক্ষিত এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে পুনম এবং যুদ্ধাহত জওয়ান দ্বীপচাঁদ সিংহের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সেনাবাহিনী তার সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং ভিডিওতে বর্ণিত অভিযোগ তদন্তে তার সহযোগিতা চায়। ভিডিওতে দেখানো হয় সৈনিকরা কর্মকর্তাদের কুকুর পালন করছে, সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে, অফিসারদের স্ত্রীদের পারলারে ড্রাইভ করে পৌঁছে দিচ্ছে। পুনম সেনাবাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দেন। পুনম ও দ্বীপচাঁদ আগাম জামিনের আবেদন করলে মুম্বাই হাইকোর্টের বিচারপতি রেবতি মোহন দেরে জামিন মঞ্জুর করেন এবং আদেশের তিন দিনের মধ্যে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় হাজির হওয়ার এবং তার ধারণকৃত রেকর্ডসমূহ প্রদানের নির্দেশ দেন। পুনম আদালতের আদেশ মান্য করেন। জামিন মঞ্জুর করার সময় হাইকোর্টের বিচারপতি বলেন, ভিডিওটি দেখার পর এটাই মনে হয়েছে যে অনুসন্ধানের লক্ষ্য সেনা সহায়কদের দিয়ে যে ব্যক্তিগত কাজ করানো হয়, সেটা প্রমাণ করা। এ অবস্থায় প্রাথমিকভাবে সন্দেহ হয়, ভারতীয় পেনাল কোড বা অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট আকৃষ্ট করার মতো কোনো উপাদান এতে নেই। কেবল অনুসন্ধান করার কারণে এসব আইন প্রযুক্ত হওয়া যুক্তিযুক্ত নয়।

মামলাটি খারিজ করার আবেদনে (কোয়াশমেন্ট) শুনানির পর মুম্বাই হাইকোর্ট অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট এবং ভারতীয় দন্ডবিধির মৃত্যুর প্ররোচনাকে ‘প্রতিহিংসাপরায়ণ’ উল্লেখ করে মামলাটি খারিজ করে দেয়।

হাইকোর্টের বিচারপতি রঞ্জিত মোরে এবং ভারতী ডাঙ্গরের বেঞ্চ মন্তব্য করে, এমনকি ‘প্রাইসা ফেসি’ মামলার উপাদানও এখানে নেই। ‘আগরওয়াল এমন কিছু করেননি যা জাতীয় স্বার্থকে বিঘ্নিত করবে।’ কোর্ট আরও বলেছে, এই মামলায় সেনাবাহিনী ‘প্রতিহিংসামূলক’ আচরণ করেছে। জাস্টিস মোরে এ কথাটি আরও জোর দিয়ে বলেছেন (পিটিআই ডেসপাচ ১৮ এপ্রিল ২০১৯, অনেক পত্রিকায় প্রকাশিত)। অ্যাডভোকেট গোপাল সুব্রামানিয়াম ও অ্যাডভোকেট প্রশান্ত কুমার এই আইনের অপব্যবহারের সূত্র ধরে আইনটির সঠিক ব্যবহারে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রার্থনা করেছেন। গোপন বিষয় যদি রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা ও স্বার্থবিরোধী হয়ে থাকে, তাহলে সেই গোপনীয়তার হেফাজতকারীদের দায়িত্ব কী?

পুনম আগরওয়ালের মামলাটি অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট নিয়ে একটি চক্ষু উন্মোচন মামলা।

লেখক সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট

momen98765@gmail.com

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?