রবিবার, ১৯ আগস্ট ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই, ২০১৮, ০৫:২০:২৬

আমরা কি কেবল দর্শক হয়েই থাকব?

আমরা কি কেবল দর্শক হয়েই থাকব?

খালিদ ফেরদৌসঃ-দেশ ও খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণের সংখ্যা, পরিসর ও ব্যাপ্তির দিক দিয়ে ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় আসর অলিম্পিক গেমস। যদিও জনপ্রিয়তা, দর্শক সংখ্যা, উচ্ছ্বাস-উন্মাদনার দিক দিয়ে ফুটবল বিশ্বকাপ অদ্বিতীয়।
এ জন্য পৃথিবীতে এত বড় ক্রীড়া আসরের ভেতর ফুটবল বিশ্বকাপকে বলা হয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও মহিমান্বিত আসর। চার বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয় ফুটবল বিশ্বকাপ। একক খেলা হিসেবেও বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলার নাম ফুটবল। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সদস্য দেশের সংখ্যা জাতিসংঘসহ যেকোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার চেয়ে বেশি। এই উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা দারুণভাবে ছুঁয়ে যায় বাংলাদেশকেও।
ফুটবল বিশ্বকাপ আসলে বাংলাদেশের আকাশ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেনসহ নানা পতাকায় ছেয়ে যায়। বাংলাদেশের আকাশে অন্যদেশের পতাকা উড়ানোর বিরুদ্ধে এক ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট করে, কিন্তু মহামান্য হাইকোর্ট মানুষের ফুটবল আবেগের কথা বিবেচনা করে রিট খারিজ করে দিয়েছে। এক বয়স্ক ব্যক্তি জার্মানির হোমিওপ্যাথিক ওষুধ খেয়ে জটিল রোগ থেকে মুক্তি পায়। এ জন্য সে দেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ নিজের ভিটে-মাটি বিক্রি করে ৬ মাইল লম্বা জার্মানির পতাকা বানায়। এ জন্য তাকে জার্মান দূতাবাস থেকে ভোজের আমন্ত্রণ জানায় এবং সুবিধাজনক সময়ে জার্মান দেশ ভ্রমণের প্রতিশ্রুতি দেয়। অন্যদিকে এক ব্রাজিল সমর্থক নিজের বাড়ির রং পতাকার রং-এ রাঙিয়ে বাড়ির নাম দিয়েছে ‘ব্রাজিল বাড়ি’। এর পুরস্কার স্বরূপ ব্রাজিল রাষ্ট্রদূত এই বাড়িটি পরিদর্শনে যান।
ভালো কথা। তবে এদেশের ফুটবল উন্মাদনা অনেক ক্ষেত্রে উন্মত্ততায় রূপ লাভ করেছে। সমর্থকদের মধ্যে বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে ভিনদেশি ফুটবল দল নিয়ে বিতর্ক, নোংরা ও প্রতিশোধ পরায়ণ মনোভাবে গড়িয়েছে।
ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একদেশের সমর্থক অন্যদেশের সমর্থককে অকথ্য ভাষায় আক্রমণ, চরিত্রহরণ করছে। যা অনেক ক্ষেত্রে শিষ্টাচারের ন্যূনতম সীমাও অতিক্রম করে পাগলামোতে পরিণত হয়েছে। ন্যক্কারজনকভাবে একদেশের সমর্থকের হাতে অন্য দলের সমর্থকের লাঞ্ছিত ও প্রহারের ঘটনা বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়ে থাকে হরহামেশা। দেশের শীর্ষ দৈনিকের শিরোনাম ছিল-‘খুলনায় আর্জেন্টিনার দুই সমর্থককে কুপিয়েছে ব্রাজিল সমর্থকরা’ ‘আর্জেন্টিনার সমর্থক ব্রাজিল সমর্থক পরিবারের তিন সদস্যকে পিটিয়েছে।’ আইসল্যান্ডের বিরুদ্ধে মেসির পেনাল্টি মিস করার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে এক গোড়া আর্জেন্টিনার সমর্থক গায়ে আগুন ধরিয়ে দেবার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন দেশের ফুটবল সমর্থকদের দল হারার কারণে টিভি ভেঙে ফেলা খুব সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এটা আমাদের জাতিগত নির্বুদ্ধিতা ও মানসিক দৈন্য ছাড়া কিছু হতে পারে না।
ফুটবলকে যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আপাত বিবেচনা করা হয় তবে আশাবাদী হবার সুযোগ ক্ষীণ। ফুটবলে ভারত অনেক চেষ্টা করেও তেমন কিছু করতে পারেনি। তাদের ফুটবল র্যাংকিং ১৫৯তম, বাংলাদেশ ১৯৪তম। বাংলাদেশের ফুটবল যেভাবে এগোচ্ছে তাতে এই খেলাটির ভবিষ্যত্ ভালো বলে আপাত মনে হয় না। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে দেশের ফুটবল অবকাঠামো ঢেলে সাজাতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের তুলে আনার জন্য পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা করে ফুটবলের দেশজকরণ খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ অল্পদিনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফলতা অসম্ভব। বাংলাদেশের ক্লাবগুলো এক সময় দেশীয় আঙিনায় রমরমা অবস্থায় ছিল। আশি ও নব্বইয়ের দশকে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে পুরো দেশ আবাহনী-মোহামেডানে বিভক্ত হয়ে যেত। স্টেডিয়ামে দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়ত। বিটিভির সাদা-কালো স্ক্রিনে থাকত সমগ্র দেশের মানুষের উত্সুক চোখ। এই ক্লাব খেলা থেকে অনেক আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার যেমন মতিউর মুন্না, সালাউদ্দিন, কানন, সাব্বির, কায়সার হামিদের মতো খেলোয়াড় সৃষ্টি হয়েছে। এখন ফুটবল ঢাকা কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। তাদের খেলার মান ও সক্ষমতা পেশাদার ফুটবলারদের মতো নয়। তাই বাংলাদেশের ফুটবল ধুঁকছে। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় আপাতত ফুটবলের দেশজকরণের কোনো বিকল্প নেই। এটি করা সম্ভব হলে দেশীয় ক্লাবগুলো তাদের হারানো গৌরব ও ঐতিহ্য আবার ফিরে পাবে। পাশাপাশি হকি, শুটিং, কাবাডি, ভলিবলে বিনিয়োগে ভালো ফলাফল আসবে বলে অনেকের ধারণা। যা বাংলাদেশকে বিশ্বের ক্রীড়াঙ্গনে একটা পরিচিত নামে পরিগণিত করবে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নতি করতে হলে দর্শক তথা জনগণের মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। ফুটবল গোলের খেলা এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই কিন্তু খেলাকে শুধু গোল ও জয়-পরাজয় দিয়ে বিবেচনা করাটা সমীচীন হবে না। ফুটবলে গোলের বাইরেও অনেক মজা লুক্কায়িত আছে।
দুঃখের বিষয় সমর্থকদের এই বিবেচনাবোধের খুব অভাব। যদি তাই না হতো তাহলে ফুটবল দর্শকরা জার্মানি, আর্জেন্টিনা, স্পেন, ব্রাজিল বিশ্বকাপের প্রথম দিকে বিদায়ের ধুয়ো দিত না। আর্জেন্টিনার সমর্থকসহ প্রায় সব ফুটবলপ্রেমী মেসিকে যাচ্ছেতাই বলে গালমন্দ করছে। তারা বেমালুম ভুলে যাচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের সবচেয়ে বেশি উচ্চতায় অসাধ্য ম্যাচে এই মেসি হ্যাটট্রিক করে বলিভিয়ার বিরুদ্ধে জিতে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে তুলেছিল। ভ্লাদিমির পুতিন, ফিফা প্রেসিডেন্টসহ অনেক ফুটবলবোদ্ধা আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপে ওঠা যখন পেন্ডুলামের মতো ঝুলছিল তখন বলেছিল “আর্জেন্টিনা তথা মেসি যদি বিশ্বকাপে না খেলতে পারে তবে বিশ্বকাপের জৌলুসে ভাটা পড়বে।”
যা হোক, বাংলাদেশ ফুটবল বিশ্বকাপ খেলবে এবং অন্যদেশের পতাকার স্থানে আমাদের অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত লাল-সবুজের পতাকা বাংলার আকাশে পতপত করে উড়বে এটা এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে। এমন মহান উপলক্ষ আমাদের ফুটবলের ইতিহাসে কবে ঘটবে তা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলা মুশকিল। এমন জটিল সমীকরণে ফেলে আমাদের ফুটবলের ভবিষ্যদ্বাণী করার অর্থ এই নয় যে কোনোদিন এদেশ ফুটবল বিশ্বকাপ খেলতে পারবে না। এখানে বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের ফুটবলে বিশ্বকাপ সম্ভাবনাকে ছোট করে দেখা হচ্ছে না। আবহাওয়া, শারীরিক সক্ষমতা, ফুটবল অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনায় নিলে এবং মহাদেশীয় কোটা পদ্ধতি তুলে দিলে এশিয়া থেকে দু’একটি দল ছাড়া বিশ্বকাপে অনেক দেশ খেলার সুযোগ হারাবে।
মূলত কোটা পদ্ধতির কারণেই ইতালি, নেদারল্যান্ডসের মতো ফুটবল পরাশক্তি বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারে না। লাতিন আমেরিকা অঞ্চল থেকে আর্জেন্টিনার মতো দলকেও অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে হয়। সর্বশেষ পরপর দুই দু’বার কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন চিলির মতো দলকে বিশ্বকাপের দর্শক হয়ে থাকতে হয়। এইজন্য অবশ্য ফিফা মহাদেশীয় কোটা পদ্ধতি সংস্কার করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
ফিফার উচিত হবে বাংলাদেশের মতো ফুটবলে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোকে নানাভাবে সহযোগিতা করে ফুটবল সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে দেওয়া। অবশ্য ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য ফুটবল বিশ্বকাপ যখন  ৪৮টি দল অংশগ্রহণ করবে তখন এই সমস্যার অনেকটা সমাধান হবে বলে আশা করা যায়।
তারপরও ফুটবল সমর্থকদের বিশ্বকাপের নির্মল আনন্দ উপভোগের পাশাপাশি এক ফুটবল দলের সমর্থকদের অন্য দলের সমর্থকদের প্রতি বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা, অন্যের যুক্তি যৌক্তিকভাবে গ্রহণের সংকীর্ণতা, অতিরঞ্জিত বিতার্কিক মনোভাব পরিত্যাগ করে পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে নিজেদের দেশজ খেলাধুলা, শিক্ষা, রুচিশীলতা, কৃষ্টি-কালচার, সভ্যতা ও ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে হবে। সতর্ক ও সচেতনভাবে মনে রাখতে হবে, ফুটবল যত যাই হোক দিনশেষে এটা শুধু একটা খেলা। এক্ষেত্রে ফুটবল সম্রাট এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো ওরফে পেলের কথায় সুর মিলিয়ে বলতে হয়, “অন্যের অনুকরণ না করে নিজেদের স্বকীয়তা অর্জন করা শ্রেয়।” এই মহান বাণী একটি দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য অনস্বীকার্য।
(লেখক :শিক্ষার্থী, এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) (সংগৃহিত)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

অনগ্রসর বিবেচনায় নারী, নৃগোষ্ঠীদের জন্য জন্য সরকারি চাকরিতে যে কোটা রয়েছে, তা তুলে দেওয়ার পক্ষে মত জানিয়ে কোটা পর্যালোচনা কমিটির প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেছেন, অনগ্রসররা এখন অগ্রসর হয়ে গেছে। আপনি কি তার সঙ্গে একমত?