সোমবার, ২২ অক্টোবর ,২০১৮

Bangla Version
SHARE

শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ০৭:১৪:২০

অসহিষ্ণুতাঃ বহুত্ববাদের ধারাকে ধরে রাখতে হবে

অসহিষ্ণুতাঃ বহুত্ববাদের ধারাকে ধরে রাখতে হবে

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুঃ-বহুত্ববাদের ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রে বহু ধর্মমতের মানুষ থাকতে পারে। বাংলাদেশ ‘বহুত্ববাদে’ বিশ্বাসী একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র। ‘বাঙালি’ কথাটা নিয়ে অনেকের মধ্যে এখনো ভুল ধারণা কাজ করে। অনেকে মনে করেন যে, বাঙালি কথাটা মুসলমান অর্থে বুঝানো হয়। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়। এটা আমাদের ভাষাগত পরিচয় যা আমাদের জাতীয় পরিচয়ও বটে। মূলত, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ভিত রচিত হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে গড়ে ওঠা দুর্বার আন্দোলন ১৯৭১ সালে পূর্ণতা লাভ করেছিল। একটি জাতির নিজস্ব দেশ, ভাষা এবং আত্মপরিচয় থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। এর সবটাই আমাদেরকে সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়েছে।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যে উচ্চ মূল্য এদেশের মানুষকে দিতে হয়েছে তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল এক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তাই একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা পেয়েছে। বাঙালি হিসেবে এতে আমাদের গর্বের শেষ নেই। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ জাতিধর্ম নির্বিশেষে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। বাংলা একদিকে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা অপরদিকে রাষ্ট্রভাষাও। এদেশে বসবাসরত হিন্দু, মুসলিম এবং বৌদ্ধ জাতিগোষ্ঠী সমূহের মধ্যে বাংলা যাদের মাতৃভাষা তারাই বাঙালি। বাঙালি কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায়গত কিংবা ধর্মীয় পরিচয় নয়। এটা আমাদের জাতীয় পরিচয়। আর যাদের মাতৃভাষা বাংলা নয়, তারা অবাঙালি। তবে এদেশের বাঙালি, অবাঙালি, পাহাড়ি কিংবা আদিবাসী সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা সবাই বাংলাদেশি। এটা আমাদের রাষ্ট্রীয় বা নাগরিক পরিচয়। পাহাড়ি কিংবা আদিবাসী এবং ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী সমূহের নিজস্ব মাতৃভাষা আছে। তারা অবাঙালি কিন্তু বাংলাদেশি। এদেশের কোন অবাঙালি বাঙালি পরিচয় বহন করতে না চাইলে তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কোন যৌক্তিকতা নেই।
২.
বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যের দেশ বাংলাদেশ। এই ভূখণ্ডে এই বৈচিত্র্যতা কেবল পাকিস্তান আমল কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী গড়ে ওঠেনি। এই বৈচিত্র্যতা শত শত বছরের পুরানো। আমরা কেবল এই বৈচিত্র্যতাকে বংশানুক্রমে লালন করছি। ধর্মের ভিত্তিতে এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা থেকেই ভারত এবং পাকিস্তান আলাদা হয়ে গিয়েছিল। ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র বহুত্ববাদে বিশ্বাসী কিংবা শ্রদ্ধাশীল এবং সহিষ্ণু হওয়ার কথা নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে কেবল ধর্মের মিলটাই বেশি ছিল। সংস্কৃতি এবং ভাষার দুরত্ব ছিল যোজন যোজন। বাঙালির সংস্কৃতি বৈচিত্র্যতা, এই অঞ্চলের ভাষা বৈচিত্র্যতা এবং বহুত্ববাদকে পাকিস্তান সম্মান কিংবা সহ্য করতে পারেনি। ভাষা এবং আদর্শগত দুরত্ব থাকার কারণে পাকিস্তান এই অঞ্চলের মানুষের উপর শোষণ, নির্যাতন এবং নিপীড়ন চালাত। বহুমূখী এই নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে এবং বহুত্ববাদকে রক্ষা করতেই একই ভূখণ্ডের দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা মনে করে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার যুদ্ধ। অপরদিকে এই অঞ্চলের মানুষেরা মনে করেন এটা তাদের স্বাধীনতা তথা মুক্তির সংগ্রাম। যে সংগ্রামের মূল চালিকা শক্তি ছিল জনগণের স্বাধীনতার প্রবল আকাঙ্ক্ষা এবং প্রধান সেনাপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যার ডাকে পাহাড়ি, বাঙালি, আদিবাসী, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান এই অঞ্চলের সর্বস্তরের জনগণ মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অবশেষে এই যুদ্ধে বহুত্ববাদের জয় হল। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার জয় হল।
৩.
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল শোষণ, নির্যাতন এবং নিপীড়ন মুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। জাতির পিতা এই লক্ষে দৃঢ় পদক্ষেপে এগোচ্ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই ৭৫’এ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশকে নতুন করে ঘোর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। সেই থেকে পুরো আশির দশকজুড়ে দেশে কোন নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ছিল না। জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়ে মহান জাতীয় সংসদ নির্বাচের মধ্য দিয়ে শুরু হল নতুন এক বাংলাদেশের পদযাত্রা। সেই থেকে অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে আজকের এই বাংলাদেশ। এরিমধ্যে জঙ্গিপনার মত সামাজিক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব গোটা দেশকে ভাবিয়ে তুলেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের একাংশ বিপথগামী হচ্ছে। তাদের সংখ্যাও ক্রমশ বাড়ছে। মতের অমিল কিংবা আদর্শগত ভিন্নতার কারণে তারা মানুষ হত্যা করছে। তাদেরকে ভুল বুঝিয়ে ভুল পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তারা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের উপর কারণে-অকারণে নানান ছুতোয় ঝাঁপিয়ে পড়ছে। অথচ এটা এদেশের মানুষের চিরায়ত ঐতিহ্যের সাথে মোটেও যায়না। এই অঞ্চলের মানুষ স্বভাবত সহিষ্ণু এবং শান্তিকামী বলেই যুগ যুগ ধরে জাতিধর্ম নির্বিশেষে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে পেরেছেন। একই স্থানে নগন্য দূরত্বের মধ্যে মন্দির, মসজিদ, বিহার, গির্জাসহ সকল সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি এবং কাছাকাছি গড়ে উঠেছে। আমি বিশ্বাস করি যে, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সহিষ্ণুতা এদেশের মানুষের রক্তে মিশে আছে। চলার পথে সময়ে সময়ে বিভিন্ন স্থানে অসহিষ্ণুতা এবং সাম্প্রদায়িক যে ঘটনাগুলো ঘটে এসব ঘটনার পেছনে কোন না কোন স্বার্থ জড়িত থাকে। কোন না কোন স্বার্থান্বেষী মহল এর পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু দুঃখজনক হলো তারা বরাবরই অধরা রয়ে যায়। দেশের মানুষ তাদের নোংরামি দেখে, কিন্তু তাদের নোংরা চেহারাগুলো দেখার সুযোগ পায় না। এই সুযোগে তারা পর্দার আড়ালে থেকে সফলভাবে খেলে যায়।
৪.
অসহিষ্ণুতা, উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণ খুঁজতে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা, সেমিনার, সংলাপ, কর্মশালা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়াগুলোও সংলাপ এবং বৈঠকির আয়োজন করছে । এসব আয়োজনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমারও অংশগ্রহণের সৌভাগ্য হয়। গত ২৬ জুন একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি গোল টেবিল বৈঠকে গিয়েছিলাম। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ‘শান্তি ও সহিষ্ণুতা: প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায়’।
এই বৈঠকের সারসংক্ষেপ গেল ১ জুলাই হোলি আর্টিজানের এক বছর স্মরণে বাংলা এবং ইংরেজি- দুটি পত্রিকায় ক্রোড়পত্র আকারে ছাপানো হয়েছিল। তৃণমূল পর্যায়ে এবং সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক ব্যাখ্যা এবং বার্তা পৌছাতে হলে এসব উদ্যোগের আরো প্রসার ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেলগুলো আরো বেশি বেশি ভূমিকা পালন করতে পারে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে একেবারে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত এমন উদ্যোগ নিতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। সব থেকে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে পরিবারকে। মানুষের জীবনে আদি বিদ্যালয় হল পরিবার এবং আদি শিক্ষাগুরু হলেন পিতামাতা। অসহিষ্ণুতা, উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এসব হচ্ছে সামাজিক ব্যাধি। সমাজে এই ব্যাধির উৎপত্তি হয় এবং সেখান থেকে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এসব ব্যাধি খোদা কিংবা দৈব প্রদত্ত নয়। পরিবারের শান্ত-শিষ্ট সন্তানটি একটু একটু করে কেন অসহিষ্ণু হয়ে ওঠছে, সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠছে, স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠছে, ধর্মান্ধ হয়ে ওঠছে সর্বোপরি জঙ্গি হয়ে ওঠছে সেটা পরিবারের চোখেই আগে ধরা পড়তে হবে। কারণ আইন-শৃংখলা বাহিনীর নজরে যখন আসে ততদিনে সে জীবন্ত লাশ হয়ে যায়। অন্যকে মারার জন্য এবং নিজেও মরার জন্য সে মরিয়া হয়ে ওঠে। এটা একটা ভয়ংকর ব্যাপার। এই প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধি থেকে প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে। এটা নিরাময়যোগ্য ব্যাধি কিন্তু চিকিৎসাটা সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার আগেই করতে হবে। যাদের কোমল মনকে বিষিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং যারা বিপদগামী হচ্ছে তারা কেবল নির্দিষ্ট কোন ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী  এবং সমাজের নয়, তারা সমগ্র রাষ্ট্র এবং জনগণের জন্য হুমকিস্বরূপ। এদেশের মানুষ তথা তরুণ প্রজন্মকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা আদৌ আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তানের মত রাষ্ট্র চান কিনা। যারা আজকে এদেশের আলো-বাতাসে বড় হয়ে উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং জঙ্গিপনায় ঝুঁকছে এবং তাদেরকে যারা ভুল পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এবং ভুল বোঝাচ্ছে তারা সেটাই চাচ্ছে। বাংলাদেশ কোন পথে যাবে সেই সিদ্ধান্ত এদেশের মানুষেকেই নিতে হবে। (সংগৃহিত)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেছেন, গুজব সনাক্তকরণে যে সেল করা হয়েছে, তা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ বা সোশ্যাল মিডিয়া পুলিশিং করবে না। আপনি কি এতে আশ্বস্ত?