বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ,২০১৭

Bangla Version
SHARE

বৃহস্পতিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৭, ০৮:৩৮:০৯

বিপন্ন পাহাড়গুলোর কথাও ভাবতে হবে

বিপন্ন পাহাড়গুলোর কথাও ভাবতে হবে

মীর আব্দুল আলীমঃ-রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড়ের চূড়ায় এখন আজিজুনের ঘর সংসার। স্বামী শহিদ মিয়া, শ্বশুর, ভাসুরকে বর্মি সেনারা কুপিয়ে ও গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। চার সন্তান নিয়ে কোনো মতে বেঁচে উখিয়ার সেনা ক্যাম্পে আশ্রয় নেন আজিজুন। এখন চোখের জলেই মাঝবয়সী এ মহিলার দিন কাটে। একদিকে আজিজুনদের কান্না, অন্যদিকে পাহাড়ের কান্নার শব্দও যেন আমি শুনতে পাই। বিধবা অসহায় আজিজুনদের আশ্রয় দিতেই পাহাড়ের গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে। ঝুপড়ি বানাতে পাহাড় কাটতে হয়েছে। কক্সবাজার থেকে উখিয়ায় আসতে পথে অসংখ্য পাহাড় চোখে পড়েছে যার সবগুলোই এখন প্রায় বৃক্ষশূন্য। সদ্য পাহাড়ের গা কেটে ছেঁটে বানানো ঝুপড়ির ফাঁকে লাল মাটি উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছে। গাছ নেই, পাহাড়ের গতরটাও ছেঁটে ফেলা হয়েছে। কী হবে পাহাড়গুলোর? এর আগে যখন এই পথ ধরে টেকনাফে গিয়েছি, সবুজের সমারোহে তখন মন দুলেছে। এখন বৃক্ষশূন্য পাহাড়ের কান্নায় মনটা ভীষণ খারাপ। একবার পাহাড়ের কথা ভাবি; আবার ভাবি আজিজুনরাই-বা কোথায় আশ্রয় নেবে?
আসলে মিয়ানমার আমাদের দেশকে এক চরম সংকটে ফেলেছে। মানবিক কারণে আমরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দিয়ে পারছি না। অন্যদিকে এত রোহিঙ্গার ভার কিভাবে সামাল দেবে দেশটি এটিই এখন প্রশ্ন। ওদের থাকার জায়গা দিতে গিয়ে পাহাড়ের গাছ কাটতে হচ্ছে। শুধুই কি গাছ? পাহাড় কেটে তবেই রোহিঙ্গাদের বসত তৈরি করতে হচ্ছে। যে পাহাড়ে মানুষ নির্মল বাতাসের আশায় ছুটত, সেই পরিবেশ এখন বিপন্ন।
এমনিতেই আমাদের পার্বত্য জেলার পাহাড়গুলোর ওপর বিবেকওয়ালাদের চোখের সামনে নির্বিচারে অত্যাচার চলছে। ইতোমধ্যে পাহাড়-খাদকরা অনেক পাহাড় খেয়ে ফেলেছে। অনেক পাহাড় তাদের হিংস্র থাবায় ক্ষত-বিক্ষত ও মৃতপ্রায়। পাহাড়-খাদকরা আগে পাহাড়ের গাছপালা কেটে সাবাড় করেছে। পরে সেখানে বাড়িঘর, দোকানপাট তুলেছে বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করেছে। এখনতো আমাদেরই পাহাড় কাটতে হচ্ছে। একদিকে অসহায় রোহিঙ্গাদের কান্না, অন্যদিকে পাহাড় কাটার কষ্ট সবই এখন আমাদের নীরবে সইতে হচ্ছে। আমরা মানবিক কারণে সব সইছি কিন্তু প্রকৃতি কি আমাদের ক্ষমা করবে? প্রকৃতি কি রোহিঙ্গাদের কান্নার মূল্য দেবে? রোহিঙ্গাদের চোখের জলে তো পাহাড় ভিজে একাকার। প্রকৃতি প্রতিশোধ নেবেই। পাহাড়ের গাছপালা আর পাহাড় ছাঁটা কাটার ফলে পাহাড় ধসবেই। এ ধস রোধ করা যাবে না কখনই।
আমাদের পাহাড়গুলোতো ফি বছর এমনিতেই ধসে। এবারো পাহাড় ধসে অসংখ্য মানুষের প্রাণ গেছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় ধসের মূল কারণ হলো পাহাড় থেকে মাটি কাটা, পাহাড়গুলো ৩০ ডিগ্রির বেশি ঢালু হলে সে পাহাড়ের পাদদেশে বিপজ্জনক অবস্থা তৈরি হয়। পার্বত্য জেলাগুলোয় রয়েছে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঢালু বহু পাহাড়। মাটির জমাট বাঁধা পাহাড় যখন কাটার মহোত্সব চলে তখন প্রবল বর্ষণ হলে মাটির ওপরের আবরণ না থাকায় যে প্রবল জলধারা নিচে ধাবিত হয় তার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাটি এসে পাহাড়ের পাদদেশে আছড়ে পড়ে। আর তখনই ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। পাহাড়ের গাছের শেকড় মাটি আটকে রাখে। গাছ কাটলে মাটি আটকে রাখার শক্তি থাকবে না। পাহাড় ধসবে।
মিয়ানমার সরকার তার দেশের নাগরিকদের এভাবে নির্যাতন এবং অন্যদেশে চলে যেতে বাধ্য করতে পারে না। আসলে মিয়ানমারের মতলবটাই অনেকে বোঝেন না। তারা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠাতেই সীমা লঙ্ঘন করে জুলুম, নিষ্ঠুরতা চালাচ্ছে। তারা চায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে চলে যাক। বাংলাদেশ শান্তিপ্রিয় তাই রোহিঙ্গারা আমাদের দেশের না হলেও বিভিন্ন সময়ই সরকার মানবিক কারণে এদের আশ্রয় দিয়েছে, এবারও দিচ্ছে। মিয়ানমার চরম সীমালঙ্ঘন করছে। তাদের দেশের নাগরিকদের আমাদের দেশে পাঠাতে যে নিষ্ঠুর নীতি তারা অবলম্বন করছে তা অন্যায় এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম পরিপন্থি। বিশ্বজুড়ে তার প্রতিবাদও হচ্ছে।
রোহিঙ্গার ভারে বিব্রতকর অবস্থা হয়েছে বাংলাদেশের। ঘনবসতিপূর্ণ এদেশে ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যাই হোক, আমাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। মিয়ানমার থেকে প্রায় ৫ গুণ কম জমিতে তাদের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি মানুষের বাস আমাদের এ দরিদ্র দেশটিতে। প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গার বাড়তি বোঝা আমরা সামাল দেব কী করে? ওদের এখনই দেশে ফেরত পাঠানো না গেলে আমাদের ভাগ্যে কী আছে তা সহজেই অনুমেয়। রোহিঙ্গাদের মধ্যে নিরক্ষতার হার বেশি। বাল্যবিবাহ, অধিক সন্তান গ্রহণের প্রবণতা তাদের মধ্যে লক্ষ করা যায়। আমি গত কয়েক দিনে রোহিঙ্গা শিবিরে ঘুরে অসংখ্য শিশু দেখেছি। ওরা এদেশে কয়েক বছর থাকলেই জনসংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে। একদিকে জনসংখ্যার চাপ, বেকারে ভরা দেশটিতে বাড়তি জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, পরিবেশ বিপর্যয় সব কিছুতে ধাক্কা খাবে বাংলাদেশ। তাই অনুমান করা যায় সামনের দিনগুলো খুব ভালো যাবে না। ভয় একটি বাড়তি আছে তা হলো পাহাড় ধসের। এদেশে এমনিতেই পাহাড় ধসে মানুষ মরে। এর তীব্রতা অনেক বেড়ে যাবে। পাহাড়গুলোই-বা রক্ষা হবে কী করে আর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যারা পাহাড়ের নিচে বাস করছে তাদেরই-বা আমরা রক্ষা করব কী করে? (লেখক: গবেষক), সংগ্রহ-ইত্তেফাক।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

পুলিশের আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক বলেছেন, ‘দেশকে জঙ্গি, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে হলে পুলিশের পাশাপাশি জনগণকে কাজ করতে হবে।’ আপনিও কি তাই মনে করেন?