বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ,২০১৭

Bangla Version
SHARE

রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ০১:৫৯:৫৬

দেশে সাময়িক খাদ্যাভাব ও খাদ্য রাজনীতি

দেশে সাময়িক খাদ্যাভাব ও খাদ্য রাজনীতি

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীঃ-চালের দাম বেশ বেড়েছিল, এখন কমছে। তবে খুব ধীরে ধীরে। দেশে খাদ্যসংকট প্রকট হয়ে উঠবে এই আশঙ্কাটা সত্য হয়নি। এটা আশঙ্কা ছিল না, ছিল প্রচার। ঢাকার একটা বাংলা দৈনিকে খবরের হেডিং দেওয়া হয়েছিল মোটা চালের দাম হু হু করে বাড়ছে। আসল আশঙ্কাটা ছিল, একশ্রেণির মিডিয়ার প্রচারণার ফলে দেশে সত্যি সত্যি খাদ্য সংকট সৃষ্টি না হয়। অসাধু ব্যবসায়ীরা এই প্রচারণায় উত্সাহী হয়ে গুদামে খাদ্য লুকিয়ে ফেলে বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি ঘটিয়ে তার দাম বাড়াতে না থাকে। এমনকি বন্যাজনিত কারণের সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো দুর্গম এলাকায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি সৃষ্টি না করে, বিএনপি ও তাদের সমগোত্রীয় রাজনীতিকরা তো মুখিয়েই আছেন, দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে এই প্রচারণা চালিয়ে কিভাবে খাদ্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো যায় এবং ক্ষমতাসীন সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটানো যায়।
এবার এই অবস্থাটা সরকার ঘটতে দেননি। তাদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে গৃহীত সুপারিশ অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করায় খাদ্য পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। তবুও দেশে অতি বৃষ্টি ও প্লাবনের মুখে জলমগ্ন ক্ষেতে বহু শস্য নষ্ট হওয়ায় সরকারের অনেক আগেই এ সম্পর্কে সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। যে দেশটিকে তারা খাদ্যে উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত করেছেন, সে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অন্যান্য কারণে শস্য উত্পাদন কখনো কখনো কম হতেই পারে। বাংলাদেশে এবার তা-ই হয়েছে। শুধু বাংলাদেশে নয়; বিশ্বের বাজারেও খাদ্যমূল্য বিশেষ করে চালের দাম এবার বেড়েছে।
এই পরিস্থিতি সামনে রেখে সম্ভাব্য খাদ্য ঘাটতি সামলানোর জন্য বিদেশ থেকে চাল আমদানিতে সরকারের বহু আগে উদ্যোগী হওয়া উচিত ছিল। সরকার একটু দেরিতে এই উদ্যোগ নিয়েছেন। খবরের কাগজের রিপোর্ট পাঠ করে যতটুকু জেনেছি, সরকার ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে চাল আমদানির ব্যবস্থা করেছেন। তাতে সংকট উতরে যাবে। কিন্তু ভিয়েতনাম থেকে চাল যথাসময়ে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের চাল এখন পর্যন্ত এসে পৌঁছেনি। ইতোমধ্যে যদি এসে পৌঁছে থাকে, তাহলে ভালো কথা। নইলে এই আমদানি যাতে বিলম্বিত না হয় এবং খাদ্য ঘাটতি নিয়ে কেউ বা কোনো মহল অমানবিক রাজনীতি করতে না পারেন, সেদিকে সরকারের সতর্ক সৃষ্টি রাখা দরকার।
এই আশঙ্কার কথাটা লিখলাম এজন্য যে, আমরা বাঙালিরা ঘরপোড়া গরু। তাই আকাশে সিঁদূরে মেঘ দেখলেই ভয় পাই। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার যখন ক্ষমতায়, তখন বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত প্লাবিত হয়েছিল। কোনো কোনো অঞ্চল এমনভাবে প্লাবিত হয়েছিল যে, হেলিকপ্টার থেকে জলবন্দি মানুষের জন্য খাদ্য নিচে ফেলারও এক ইঞ্চি শুষ্ক জমি ছিল না। এ সময় মহল বিশেষ জোর প্রচারণা শুরু করেছিল, দেশে মহাদুর্ভিক্ষ আসন্ন, এই প্রচারণায় উত্সাহিত হয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজারে যে খাদ্য ছিল, তাও গুদামে লুকিয়ে ফেলে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির ও অতি মুনাফার সুযোগ পেয়েছিল।
তখন সরকারের প্রশাসনের মধ্যেই ত্রাণ তত্পরতায় সাবোটাজ ঘটনার জন্য একদল লোক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তত্পর ছিল। বিদেশ থেকে যে ত্রাণসামগ্রী এসেছে, তার বেশির ভাগ দুর্গতদের হাতে পৌঁছেনি। বহু ত্রাণ সামগ্রী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তা নদীর স্রোতে ভাসতে দেখা গেছে। এই সময়েই ম্যান ছেরু মিয়ারও আবির্ভাব। বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে সরকার উচ্ছেদের জন্য বিদেশি ষড়যন্ত্রও যুক্ত হয়। বঙ্গবন্ধুর সরকার দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা আঁচ করেই আমেরিকার সঙ্গে খাদ্য আমদানির চুক্তি করেছিলেন। ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যে এই খাদ্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রামে পৌঁছার কথা ছিল।
কিন্তু তত্কালীন মার্কিন সরকারের ষড়যন্ত্রে এই খাদ্যবাহী জাহাজগুলো হাই সী’তে বহুদিন ঘুরে বেড়ায় এবং খাদ্যাভাবে লক্ষাধিক নরনারীর মৃত্যু ঘটে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এই খাদ্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রামে পৌঁছে এবং মোশতাক-জিয়া সরকার খাদ্য সংকট দূর করার বাহবা অর্জন করে। তাদের অবৈধ ক্ষমতা গ্রহণকে স্থিতিশীল করার কাজে এভাবে সাহায্য জোগানো হয়। এর কিছুকাল পরেই আমেরিকায় ফরেন এফেয়ার্স সাময়িকীতে স্বীকার করা হয়, উন্নয়নশীল ও সদ্য স্বাধীন দেশগুলোতে আমেরিকার অপছন্দের সরকারগুলোকে (বাংলাদেশের মুজিব সরকার সহ) ক্ষমতা থেকে উত্খাতের জন্য মার্কিন খাদ্য সাহায্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল ফুড এজ উইপন।
বাংলাদেশে আড়াইশ বছরের মধ্যে তিনটি বড় দুর্ভিক্ষ হয়। একটি বাংলা ১২৭৬ সালে। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দ মঠ’ উপন্যাসে এই দুর্ভিক্ষের কথা আছে। ব্রিটিশ আমলের প্রথমদিকে এই দুর্ভিক্ষে বহু লোক মারা যায়। ব্রিটিশ আমলের শেষদিকে বাংলা ১৩৫০ সালে আবার অবিভক্ত বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ৫০ লাখ লোক মারা যায়। স্বাধীন বাংলাদেশে ইংরেজি ১৯৭৪ সালে বন্যা ও প্লাবনজনিত কারণে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়। লক্ষাধিক নর-নারী তাতে মারা যায়। এ সকল দুর্ভিক্ষ, উত্তরবঙ্গে পৌনঃপুনিক মঙ্গা ইত্যাদি কারণে বিদেশে প্রচারিত হয়েছিল, বাংলাদেশ চিরকালই খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষের দেশ।
কিন্তু বাংলা ১৩৫০ সালের ব্রিটিশ আমলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর পরই ব্রিটিশ ভাইসরয়ের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শ্রী জওলাপ্রসাদ শ্রীবাস্তব বলেন, বাংলাদেশে বাংলা ১৩৫০ সালের দুর্ভিক্ষ ‘মেন মেড ফেমিন’ বা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ। এ সময় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে। জাপানিরা বর্তমান মিয়ানমার দখল করে আকিয়াব পেরিয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছে। কলকাতা ও চট্টগ্রামে বোমাবর্ষণও করেছে।
ব্রিটেনের চার্চিল সরকার ভেবেছিলেন, বাংলাদেশ সম্ভবত জাপানের দখলে চলে যাবে। এই আশঙ্কায় বাংলাদেশে বিশাল খাদ্যশস্যের ভাণ্ডার যাতে শত্রুপক্ষের হাতে না পৌঁছে, সেজন্য চাল, গম ইত্যাদি গুদামে লুকিয়ে ফেলে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রধান মাধ্যম নৌকা ধ্বংস করে ফেলা হয়। এর সুযোগ নেয় অসাধু ব্যবসায়ীরা। তারা কৃত্রিম খাদ্য সংকট সৃষ্টি করে ৫০ লাখ লোকের মৃত্যু ঘটায়। শ্রীবাস্তব বলেছেন, দুর্ভিক্ষে ৫০ লাখ নর-নারীর মৃত্যুর জন্য অসাধু ব্যবসায়ীরা মাথাপিছু এক হাজার টাকা মুনাফা অর্জন করে।
শ্রী জওলা প্রসাদ শ্রীবাস্তব তার রিপোর্টে লিখেছেন, তখন অবিভক্ত বাংলাদেশে মোটেও খাদ্যাভাব ছিল না। কিন্তু সীমান্তে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতেই সব খাদ্যশস্য যেন এক ‘অতলস্পর্শী গুহায়’ চলে যায়। ৫০ লাখ লোকের মৃত্যু এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই বিশাল খাদ্যশস্য গুদাম থেকে বের করা হয়। ততদিনে তাতে পচন ধরেছে। এই পচা চাল ও গম বাজারে ছাড়া হয় এবং তা খেয়ে মহামারীতে আরো ১০ লাখ লোকের মৃত্যু হয়।
ভাগ্যের পরিহাস, ব্রিটিশ শাসকদের পরিকল্পিত এই দুর্ভিক্ষ যখন বাংলাদেশে শুরু হয়, তখন ফজলুল হক ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। দুর্ভিক্ষের জন্য তাকে দায়ী করে মুসলিম লীগ সমর্থক একটি ইংরেজি ও বাংলা দৈনিক ‘দেশে দুর্ভিক্ষ ধেয়ে আসছে বলে অতিরঞ্জিত প্রচারণা চালাতে শুরু করেছিল।’ কিন্তু দুর্ভিক্ষ পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই ব্রিটিশ গভর্নর স্যার জন হার্বার্ট হক মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করেন এবং মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা গঠন করে। এই মন্ত্রিসভায় খাদ্য ও অসামরিক সরবরাহ বিভাগের মন্ত্রী ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি দুর্ভিক্ষ ঠেকানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যুদ্ধকালীন ব্রিটিশ সরকারের নীতির জন্য পারেননি। পরবর্তীকালে ৫০-এর দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে দায়ী করে প্রচারণা চালানো হয়েছে। যা ধোপে টেকেনি।
ইংরেজি ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষও ছিল মনুষ্যসৃষ্ট। এর সঙ্গে বিদেশি চক্রান্তও যুক্ত হয়েছিল। সে কথা আগেই লিখেছি। অতিবৃষ্টি, বন্যা ও প্লাবনে খাদ্যশস্য নষ্ট হয়ে খাদ্যাভাব অবশ্যই দেখা দিয়েছিল, কিন্তু তাকে অতি প্রচারণা দ্বারা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের উত্সাহিত করে দুর্ভিক্ষে পরিণত করায় সাহায্য জুগিয়েছিল স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী।
আমার ভয় ছিল, এবারেও অতিবৃষ্টি ও বন্যাজনিত কারণে খাদ্য উত্পাদন কম হওয়ায় যে সাময়িক সমস্যা দেখা দিয়েছে, তার সুযোগ নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী এবং একালের একটি ইংরেজি ও বাংলা দৈনিক যেভাবে প্রচারণা শুরু করেছিল, তাতে বুঝি আবারো একটি মনুষ্য-সৃষ্ট খাদ্য সংকট দেখা দেবে। হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে উত্খাতের জন্য বন্যা, রোহিঙ্গা সমস্যা ও বিচার বিভাগের সঙ্গে সরকারের মনান্তরের সুযোগ নিয়ে যে চক্রান্ত দানা বেঁধেছিল, তারই একটা অংশ হবে খাদ্য সংকট সৃষ্টির ষড়যন্ত্র।
এখন খাদ্য পরিস্থিতির ধীর উন্নতির খবর পেয়ে মনে হচ্ছে, এই চতুর্ভূজ চক্রান্তের শেষ ভূজটিও সফল হবে না। তবু বলছি, সাবধানের মার নেই। সরকার বন্যা ও খাদ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরো সতর্ক হোন। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ এবং শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানে তার আন্তরিকতা প্রশংসিত হয়েছে। তার একদল মন্ত্রী ও এমপি যদি অযথা প্রধান বিচারপতির সমালোচনায় সময় নষ্ট না করে বন্যার্তদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে অধিক মনোযোগ দেন এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান, তাহলে শুধু মানবতার সেবাই করা হবে না; চক্রান্তকারীদের সকল চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেশকেও বর্তমানের চতুর্ভুজ সংকটের কবল থেকে মুক্ত করা যাবে। যারা আশা করেছিলেন ১৯৭৪ সালের মতো ঘটনা ২০১৭ সালেও ঘটানো যাবে, তাদের মুখে চুনকালি পড়বে। প্রমাণিত হবে হাসিনা-সরকার সকল চক্রান্ত ব্যর্থ করার কাজে সতর্ক ও সক্ষম। (সংগৃহিতঃ-দৈনিক ইত্তেফাক)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

পুলিশের আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক বলেছেন, ‘দেশকে জঙ্গি, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে হলে পুলিশের পাশাপাশি জনগণকে কাজ করতে হবে।’ আপনিও কি তাই মনে করেন?