শনিবার, ২৫ মে ,২০১৯

Bangla Version
  
SHARE

রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯, ০৭:১০:২৫

তৈরি হচ্ছে না কালজয়ী অভিনেতা-অভিনেত্রী

তৈরি হচ্ছে না কালজয়ী অভিনেতা-অভিনেত্রী

ডেস্ক রিপোর্টঃ-এক সময় বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল চলচ্চিত্র। নায়ক-নায়িকারা ছিলেন তরুণ-তরুণীদের আইকন-আইডল। তাদের মতো পোশাক-আশাক, ফ্যাশন, হাঁটা-চলার স্টাইল, কথা বলার ঢঙ অনুকরণ-অনুসরণ করতেন অনেকেই। সিনেমায় দেখা চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নায়ক-নায়িকাদের নানা উপাধি-বিশেষণও দিতেন দর্শকরা। রেডিও-টেলিভিশন ছাড়াও বিভিন্ন পত্রিকার পাতাজুড়ে থাকতো সিনেমার বিজ্ঞাপন। রেডিওতে নাজমুল হুসাইন-মাজহারুল ইসলামের ‘হা...ভাই আসিতেছে... রোমান্স, ড্রামা, সাসপেন্স, অ্যাকশন, কমেডিতে ভরা মিষ্টি মধুর প্রেমের ছবি...’ শোনার জন্য পুরো দুপুর রেডিওর পাশে বসে থাকতেন শ্রোতারা। ছবির দৃশ্য-গল্পের সাথে মিশে যেতেন। দর্শকরা নিজেকে খুঁজে পেতেন সিনেমার পর্দায়। কাঁদতেন, হাসতেন, আপ্লুত-আলোড়িত হতেন। পর্দায় শেষ দৃশ্যে ভিলেনের বিনাশ আর নায়ক-নায়িকার মিলন দেখে দর্শকরা এটা ভেবে ঘরে ফিরতেন যে রাজ্জাক-কবরী বা আলমগীর-শাবানা সত্যি সত্যি হয়তো বাস্তব জীবনেও স্বামী-স্ত্রী। সিনেমার কাহিনী মুখস্ত হয়ে যেতো। কোনো কোনো ডায়লগ মুখে মুখে ফিরতো। কেবল সিনোমার কাহিনী নয়, শিল্পীদের অভিনয় আর মন মাতানো গানও দর্শকের মনে গেঁথে যেতো। সেইদিনগুলো এখন গল্পের মতো মনে হয়।
হারিয়ে গেছে সেই চলচ্চিত্র মোহ। এখন আর স্বপরিবারে বা বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দলবেঁধে হলে গিয়ে ছবি দেখা হয় না কারো। হারিয়ে গেছে চলচ্চিত্রের সেই সোনালী সময়। নিভে যাচ্ছে আলো ঝলমলে পর্দার আলো। তৈরি হচ্ছে না মনে দাগ কাটার মতো ব্যবসা সফল কোন চলচ্চিত্র। কোন লিজেন্ড। সেই সোনালি দিনগুলো আজ কেবলই মধুর স্মৃতি হিসেবে হূদয়ে দোলা দিয়ে যায়। নস্টালজিয়া আক্রান্ত করে। চলচ্চিত্রের অগ্রগতির বদলে শুধু অধঃপতন হয়েছে গত দুই-আড়াই দশকে। পুরনো ঐতিহ্য ও সাফল্যের সব অর্জন হারিয়ে এক বিপর্যস্ত অবস্থার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে শিল্পটি। আর সে দিন নেই, মান্না দের গানের মতো অবস্থা হয়েছে-‘কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী বিকেলগুলো সেই, আজ আর নেই...।’
এখন নায়করাজ রাজ্জাক, ড্যাশিং হিরো সোহেল রানা, মেগাস্টার উজ্জল, সুপারস্টার ফারুক, হ্যান্ডসাম হিরো আলমগীর, রাফ এন্ড টাফ ট্রাজেডি কিং জসিম,লাভার বয় জাফর ইকবাল, হি-ম্যান হিরো ওয়াসিম ,মহানায়ক বুলবুল আহমেদ, বিউটি কুইন শাবানা, মিষ্টি মেয়ে কবরী, ইন্টারন্যাশনাল ট্যালেন্ট ববিতা, ড্রিমগার্ল সুচরিতা, মমতাময়ী আনোয়ারা, শক্তিমান অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, রাজপুত্র সালমান শাহ, কমেডি কিং টেলিসামাদ, মতি, দিলদারদের মতো কালজয়ী অভিনেতা-অভিনেত্রী-শিল্পী তৈরি হচ্ছে না আর। গত দুই দশকে বাংলা চলচ্চিত্র কয়েকজন মেধাবী, সুদর্শন, গুণী অভিনেতা-অভিনেত্রী পেলেও তারা আর লিজেন্ড হয়ে উঠতে পারেননি। সৃষ্টি করতে পারেননি স্বতন্ত্র তারকা ইমেজ, স্টাইল বা স্টারডম। দু’চারজন তারকাখ্যাতি পেলেও অন্যরা চাহিদা তৈরি করতে পারেননি।
বাংলা সিনেমার নক্ষত্র, একটি অধ্যায় বলা হয় যাকে- সেই কিংবদন্তী নায়করাজ রাজ্জাক চিরবিদায় নিয়েছেন। সেই সাদা-কালো থেকে শুরু করে রঙিন যুগ পর্যন্ত অভিনয় করেছেন দাপটের সাথে। জয় করেছেন কোটি কোটি মানুষের হূদয়। রাজ্জাকের সাথে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন রূপালী জগতের অনেক নায়িকা। তার মধ্যে রাজ্জাক-কবরী জুটির রসায়ন ছিল অনন্য। শবনম-রহমান এবং শাবানা-নাদিম, অবিভক্ত পাকিস্তানের এই দুই সাড়াজাগানো জুটির জনপ্রিয়তা ডিঙিয়ে রাজ্জাক-কবরী হয়ে ওঠেন বাংলা সিনেমার সফল প্রতিনিধি। ৬০ এর মাঝামাঝি থেকে ৯০ এর দশক পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী যুগ বলেন বোদ্ধারা। সেই সময়ে চলচ্চিত্রকে নিজেদের আলোয় আলোকিত করেছেন রাজ্জাক-কবরী, উজ্জল-ববিতা, শাবানা-আলমগীর, ফারুক-ববিতা, বুলবুল আহমেদ-ববিতা, সোহেল রানা-সুচরিতা, জসিম-রোজিনা, ওয়াসীম-অলিভিয়া বা অঞ্জু ঘোষ, জাফর ইকবাল-ববিতা, আজিম-সুজাতা, রহমান-শবনম, আনোয়ার হোসেন-আনোয়ারা, ইলিয়াস কাঞ্চন-দিতি, সালমান শাহ-শাবনূর বা মৌসুমীর মতো জুটি। কিন্তু পরবর্তীকালে মান্না, রিয়াজ, ফেরদৌস, সাকিব, শাবনাজ, পপি, অপু বিশ্বাসসহ অনেক নায়ক-নায়িকা বাংলা চলচ্চিত্রে এলেও সেই অর্থে লিজেন্ড হয়ে উঠতে পারেননি কেউই।
এ প্রসঙ্গে মেগাস্টার খ্যাত উজ্জল বলেন, আসলে কেউ লিজেন্ড হয়ে জন্মায় না। পর্দার ইমেজ অভিনেতাকে লিজেন্ড করে দেয়। নিজেকে লিজেন্ড তৈরি করতে হয়-অতি যত্নে,অতি পরিশ্রমে, সাধনায়। এখন স্টার হতে গুণ লাগছে না, সময় লাগছে না। লাগছে না কোন পরিশ্রমও। আমাদের দেশে রাতারাতি স্টার হওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। যত দ্রুত উন্নতি, তত দ্রুত পতন। তিনি বলেন, অতীতের ছবিগুলোর কাহিনী ছিল জীবন ঘনিষ্ঠ। দর্শক প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবিতে সমাজের বাস্তব চিত্র দেখতো। কখনো কখনো নিজেকে আবিস্কার করতো সেখানে। সেই ছবি,গল্প, চরিত্র আর হচ্ছেনা। এখন সবাই চলচ্চিত্রে বাণিজ্য ছাড়া কিছুই বোঝেন না। এর পেছনে আরো কারণ ও অনুষঙ্গ আছে। সিনেমা হলের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। সিনেমা হলে দর্শক কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলগুলোর আধুনিকায়ন না হওয়া। আবার দর্শক কমে যাওয়ায় এই খাতে পুঁজি বিনিয়োগও কমে গেছে। পুঁজি সংকট, চলচ্চিত্র সম্পর্কে সম্যক লেখাপড়া ও জ্ঞানের অভাব ভালো চলচ্চিত্র তৈরি না হওয়ার অন্যতম কারণ। এজন্য কালজয়ী নায়ক-নায়িকাও সৃষ্টি হচ্ছে না। সরকারি উদ্যোগে প্রতি জেলায় একটি হলকে অন্তত ডিজিটালাইজড করা দরকার। চলচ্চিত্রের বর্তমান দুর্দশার জন্য মূলত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবই অনেকটা দায়ী। বাংলাদেশে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ ফিল্ম ইনস্টিটিউট গড়ে ওঠেনি। প্রশিক্ষণের জন্য ফিল্ম ইনস্টিটিউট কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
আশির দশকের বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা হোসাইন আনোয়ার বলেন, বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী যুগ নিয়ে এখনো আমরা নস্টালজিক হই। বাংলাদেশি সিনেমার অসাধারণ সব বৈশিষ্ট্য ছিলো। বলছি সত্তর/আশির দশকের কথা। রোমান্টিক প্রেমকাহিনীর কিংবদন্তী পরিচালক কাজী জহিরের সবগুলো সিনেমার নাম ছিলো পাঁচ অক্ষরের। যেমন- অবুঝ মন, বধু বিদায়, ময়নামতি ইত্যাদি। মারদাঙ্গা সিনেমার পরিচালক মমতাজ আলীর সকল সিনেমার নাম ছিলো তিন অক্ষরের যেমন- নসিব, নালিশ ইত্যাদি। আর এই সব সিনেমার হিরো ছিলেন উজ্জল। তিনি বলেন, পৃথিবীতে বাংলাদেশের শাবানা-ই একমাত্র অভিনেত্রী যিনি একটি দেশের চলচ্চিত্র জগতে সর্বকালের সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তা নিয়ে চার শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে গিনেজ বুক অফ রেকর্ড-এ নাম লিখিয়েছেন। শাবানার কান্নায় কাঁদেননি এমন নারী দর্শক খুঁজে পাওয়া যাবেনা দেশে। কবরীর ভুবনমোহিনী হাসি মুগ্ধ করেছে সকল শ্রেণির দর্শককে। ড্রিমগার্ল ববিতার জন্য তাঁর এক ভক্ত বুকেপিঠে নাম লিখে ১৯৮৩ সালে ঢাকার প্রেসক্লাবের সামনে অনশন করেছিলেন। ববিতা ছিলেন সে সময়ের ফ্যাশন আইকন। অধিকাংশ সিনেমায় অঞ্জু ঘোষের পর্দায় আগমন হতো রোমান্টিক কোনো গানের সাথে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ ব্যবসাসফল ছবি ‘বেদের মেয়ে জোসনা’র নায়িকা তিনি। পোশাকি ছবির আরেক নায়িকা রোজিনা ছিলেন তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। অঞ্জু ঘোষের ছবির সংখ্যা ১২২ টি আর রোজিনার ২৫০ টিরও বেশি। সুচরিতা শিশু শিল্পী হিসেবে অভিনয় শুরু করলেও পরবর্তীতে নায়িকা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পান। তিনি বলেন, আমাদের নায়ক-নায়িকারা অনেকে বিদেশি ছবিতেও অভিনয় করেছেন। এদের মধ্যে ববিতা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পান সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে অভিনয় করে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে সাপ্তাহিক সিনেমা দেখার খুব প্রচলন ছিলো সে সময়। সেই সব এখন রূপকথার মতো মনে হয়।
একজন চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞের মতে, চলচ্চিত্রে একটা সময় তারকা শিল্পীর অভাব ছিল না। এফডিসি অনেক তারকার পদচারণায় মুখর থাকতো। ষাট থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত ঢাকার ছবির রমরমা অবস্থা ছিল। কবরী, শাবান, অলিভিয়া, অঞ্জনা, অঞ্জু, রোজিনা, সূচরিতা এরা আধুনিক ছিলেন তাঁদের সময়ের থেকে। দিতি তাঁর সময়কে অতিক্রম করা প্রতিভা। রাজ্জাক ছিলেন পাশের বাড়ির ছেলে। বুলবুল আহমেদ ‘মহানায়ক’ হয়ে যে অভিনয় ক্ষমতা দেখান সেখানে আর কাউকেই তাঁর সমতুল্য লাগে না। জসিম যেভাবে রক্তচোখে তাকায়, বড় হাতের মুষ্ঠিতে ঘুষি মারে- ওটা আর কাউকে মানায় না। ওয়াসিমের তারুণ্য আর কারো মতো না। উজ্জ্বলের একটা চিরসবুজ লুক ছিল। মেগাস্টার ইমেজ ছিল। ফারুক গ্রামীণ আবহতে অনন্য। জাফর ইকবালের ছিল সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা স্টাইল, ফ্যাশন, ক্রেজ ও অভিনয়। ইলিয়াস কাঞ্চনের অভিনয়, বডি ল্যাংগুয়েজে ফুটে ওঠে তিনি রাজত্ব করেছিলেন তার সময়ে। মান্নার আওয়াজে হলের পর্দা কাঁপতো। মার্শাল আর্ট দেখলে রুবেলকে বাকিদের থেকে আলাদা করা যায়। সালমান শাহ একাই একশো। অভিনয়, স্টাইল, তারকা খ্যাতি, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে অনন্তকালের একটা তৃষ্ণা তিনি। হুমায়ুন ফরীদি পর্দা আর চরিত্র শাসন করা বিরল অভিনেতা। রাজিব রাজিবই। অনেকে বলে বাঘের মতো গর্জন তাঁর। আবার কোমল অভিনয়েও মিশে যেতে পারতেন অনায়াসে। এটিএম শামসুজ্জামানকে চিনতে একসাথে তিনটি বৈশিষ্ট্যকে মাথায় আনতে হয়। খলনায়ক, ভালো মানুষ আর কৌতুক অভিনেতা। আহমেদ শরীফকে জসিমের সামনে দাঁড় করালে খেলা জমে ওঠতো। মৌসুমীর হাসিটা অতুলনীয়, দীর্ঘ ক্যারিয়ার আর অনেক সাফল্যের পালক তার মুকুটে। কিন্তু সেরকম অভিনেতা-অভিনেত্রী এখন আর গড়ে উঠছে না।
বাংলা চলচ্চিত্রের ‘ড্রিমগার্ল’ খ্যাত নায়িকা ববিতা বলেন, লিজেন্ডারী অভিনেতা-অভিনেত্রী হতে গেলে যে অনেক সাধনার দরকার। সেটায় নির্মাতা-শিল্পী-কলাকুশলীদের যৌথ প্রয়াস থাকতে হয়। আমাদের সময়ে সেই অনুকূল পরিবেশ ছিল। সেই অভিনয় এবং ছবির মান এখন আর নেই। নতুন যারা আসছেন তাদের মধ্যে অল্প পরিশ্রমে দ্রুত তারকা এবং অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার লোভ বেশি। মেধাহীনতায় ভুগছেন তারা। শূন্য থাকছে ফলাফল। নির্মাতারাও নতুনদের শিখিয়ে পড়িয়ে কাজ আদায় করে নিতে পারছেন না। নির্মাতারা যদি সঠিক নির্দেশনা দেন তাহলে হয় তো এই সংকট মোচন হতে পারে।

এই বিভাগের আরও খবর

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

ভোটের পর থেকে সংসদে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে আসা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দলের নির্বাচিতদের শপথ নেওয়ায় সম্মতি দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সঠিক কাজটিই করেছেন। আপনি কি তার সঙ্গে একমত?