শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

সোমবার, ১৪ মে, ২০১৮, ০৯:৪২:৫৮

বান্দরবানের বিভিন্ন পাহাড়ে বেড়েই চলেছে ঝুঁকিপূর্ণ বসতবাড়ি নির্মাণ

বান্দরবানের বিভিন্ন পাহাড়ে বেড়েই চলেছে ঝুঁকিপূর্ণ বসতবাড়ি নির্মাণ

বান্দরবানঃ-প্রতিবছর পাহাড় ধসে বান্দরবানে ঘটে অসংখ্য প্রাণহানীর ঘটনা। বিশেষ করে বর্ষা মৌসূম আসলেই এই পাহাড় ধ্বসের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। সামান্য বৃষ্টি হলেই ধ্বসে পড়ে ছোট-বড় পাহাড়, আর এই পাহাড় ধ্বস কেড়ে নেয় অনেক মানুষের প্রাণ। এদিকে প্রতিবছরই পাহাড় ধসে অসংখ্য প্রাণহানীর ঘটনা ঘটলে ও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসরত মানুষের সুরক্ষার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো নেয়া হয়নি না কোন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
গতবছরের ১৩ই জুন বান্দরবান সদরের কালাঘাটায় ভোর রাতে হঠ্যাৎ করে কয়েক স্থানে পাহাড় ধসে পড়ে ঝুঁকিতে থাকা বসত বাড়ির উপর। এতে পাহাড় চাপায় মারা যায় ৭জন। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে ২৩ জুলাই বান্দরবান রুমা সড়কের দলিয়ান পাড়ায় রাস্তার উপর পাহাড় ধসে পড়ে নিখোঁজ হয় ৫জন পথচারী। পরে রুমা উপজেলার পরিবার পরিকল্পনা অফিসের অফিস সহকারি মুন্নি বড়–য়ার লাশ সাঙ্গু নদীতে ভেসে গিয়ে বাঁশখালী থেকে উদ্ধার করা হয়। অন্য ৪জনের লাশ পাওয়া যায় বান্দরবানের সাঙ্গু নদীসহ কয়েকটি ঝিড়ি ঝরনা থেকে। এছাড়া ও পাহাড় ধসে বান্দরবানের থানচি ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ২জনসহ সর্বমোট ১৭ সালেই ১৩ জন মারা যায়।
এদিকে এত মৃত্যুর পরও থেমে নেই বান্দরবানের পাহাড় কেটে বসতবাড়ি নির্মাণ। গত বছরের বর্ষা মৌসুম পেরিয়ে যেতে না যেতেই পাহাড় কেটে বান্দরবান জেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে কয়েকশ বসতবাড়ি।
সুত্রে জানা যায়, বান্দরবান সদর উপজেলার কালাঘাটা, কাসেমপাড়া, ইসলামপুর, বনরূপা পাড়া, হাফেজঘোনা, বাসস্টেশন এলাকা, স্টেডিয়াম এলাকা, নোয়াপাড়া, কসাইপাড়া, লামা উপজেলার হরিনমারা, তেলুমিয়া পাড়া, ইসলামপুর, গজালিয়া, মুসলিমপাড়া, চেয়ারম্যানপাড়া, হরিণঝিড়ি, টিঅ্যান্ডটি এলাকা, সরই, রূপসীপাড়া, ফাইতং, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার উত্তরপাড়া, বাইশফাঁড়ি, আমতলী, রেজু, তুমব্রুু, হেডম্যানপাড়া, মনজয় পাড়া, দৌছড়ি, বাইশারী, রুমা উপজেলার হোস্টেলপাড়া, রনিনপাড়াসহ সাতটি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের ঢালে অপরিকল্পিতভাবে বসতি গড়ে তুলেছে প্রায় ২৫ হাজারেরও বেশি পরিবার। এবছর পাহাড়ের ঢালে নতুন নতুন বসতি গড়ে ওঠায়, গত বছরের তুলনায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সংখ্যা আরও অনেক বেড়ে গেছে। পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারীদের বেশিরভাগই হতদরিদ্র মানুষ।
স্থানীয়দের মতে, অনেকটা বাধ্য হয়েই এই  মানুষেরা পাহাড়ের ঢালে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। তাদের মতে, পাহাড়ের ভূমি অন্যান্য সমতল ভূমির চেয়ে অনেকটা সস্তা। তাছাড়া, এর চেয়ে ভালো জমি কেনার সামর্থ্যও নেই অনেকের। এ কারণেই অতিদরিদ্ররা কম দামে পাহাড় কিনে মাটি কেটে এর পাদদেশে বসতবাড়ি নির্মাণ করছেন। বিকল্প কোনও জায়গা না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই তারা এখানে বসবাস করছে। ফলে প্রতি বছরই প্রবল বর্ষণের সময় পাহাড় ধসে মৃত্যুর হার বেড়ে চলেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বান্দরবানের ইসলামপুর, লাঙ্গিপাড়া, কালাঘাটা, বনরূপা পাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে গতবারের চেয়ে আরও বেশি ঝুঁকিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বসতবাড়ি। বড় বড় পাহাড় কেটে একটির ওপরে আরেকটি এভাবে ধাপে ধাপে নির্মাণ করা হয়েছে বাড়িগুলো। ফলে দু-চার দিন প্রবল বর্ষণ হলেই পাহাড় ধসে এসব ঘরবাড়ির মানুষগুলোর প্রাণহানি ঘটতে পারে।
এ বিষয়ে ইসলামপুরের স্থানীয় বাসিন্দা মো.ইব্রাহিম বলেন, ‘এখানে যারা বসবাস করছেন, তারা অত্যন্ত গরিব এবং খেটে খাওয়া মানুষ। সরকারের প্রতি আমাদের আবেদন তাদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক।’ তিনি আরো বলেন,‘এখানে বর্ষার সময় প্রবল বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসে প্রায় সময়ই মানুষ মারা যায়। তাদের সরিয়ে না নিলে সামনের বর্ষাতে ফের পাহাড় ধসে মানুষ মারা যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।’
পাহাড়ের পাদদেশে থাকা আমেনা বেগম বলেন, ‘আমরা এখানেই থাকি। বর্ষাতেও এখানে থাকি। তবে বেশি বৃষ্টি হলে এখানে পাহাড় ধসে পড়ে। তখন থাকার মতো কোনও পরিবেশ থাকে না। তাই আমরা চাই, সরকারিভাবে আমাদের জন্য যেন একটি ভালো থাকার ব্যবস্থা করা হয়।’
পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী আরেক নারী মর্জিনা খাতুন বলেন, ‘এটি ছাড়া আমাদের আর কোনও থাকার জায়গা নেই। তাই আমাদের মরলেও এখানে থাকতে হবে, বাঁচলেও এই পাহাড়ে থাকতে হবে।’
এ ব্যাপারে স্থানীয় বাসিন্দা নূর হোসেন বলেন, ‘পাহাড় কেটে জমি নিচু করে এর পাদদেশে ঘর বাঁধার কারণেই বর্ষার সময় বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে ঘরের ওপরে ধসে পড়ে। আর এসময় ঝুঁকি নিয়ে থাকা মানুষগুলোই মাটিচাপা পড়ে মারা যায়। ’
সরকারিভাবে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, পাহাড় ধসে গত ১২ বছরে বান্দরবান জেলায় ৭৭ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ২০০৬ সালে জেলা সদরে তিন জন, ২০০৯ সালে লামা উপজেলায় শিশুসহ ১০ জন, ২০১০ সালে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় পাঁচজন, ২০১১ সালে রোয়াংছড়ি উপজেলায় দুজন, ২০১২ সালে লামা উপজেলায় ২৮ জন ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ১০ জন, ২০১৫ সালের লামায় চারজন, সিদ্দিকনগরে একজন ও সদরের বনরূপায় দুজন, ২০১৭ সালে কালাঘাটায় সাত জন ও রুমা সড়কের দনিয়াল পাড়ার পাঁচজন পাহাড় ধসে মারা যায়। এদের মধ্যে দুই-চার জন পাহাড় কাটতে গিয়ে মারা গেলেও  বেশির ভাগই মারা গেছেন বর্ষাকালে পাহাড় ধসে।
এব্যাপারে  বান্দরবান মৃত্তিকা ও পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের  প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ‘অপরিকল্পিত উপায়ে পাহাড় কেটে ভৌত অবকাঠামো, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট তৈরি করার কারণে পাহাড় ধস বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়া, গাছ কাটার কারণে পাহাড়ের ওপরের অংশের মাটি খুব সহজেই পানিতে ধুয়ে গিয়ে পাহাড়কে দুর্বল করে ফেলে। ফলে অতিবৃষ্টির সময় এসব পাহাড় সহজেই ভেঙে পড়ে। পরিণামে মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিগত কয়েক বছর ধরে পাহাড় ধসের ফলে অনেক মানুষ মাটিচাপা পড়ে মারা গেছেন। বাড়িঘর ভেঙে গেছে। রাস্তঘাট বন্ধ হয়ে গেছে। তাই আমাদের এখনই সর্তক হতে হবে। পরিকল্পিত উপায়ে বাড়িঘর নির্মাণ করতে হবে।’
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেন বলেন, ‘আমি বান্দরবানের সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে এবিষয়ে একটি বৈঠক করেছি। ওই বৈঠকে কোন কোন পাহাড়ে কী পরিমাণ মানুষ ঝুঁকিতে বসবাস করছে, জরুরি মুহূর্তে তাদের যেন অন্য স্থানে সরিয়ে আনা যায়, এসব বিষয়ে তথ্য জানতে চেয়েছি।’ জেলা প্রশাসক আরো বলেন, ‘এছাড়া, জরুরি মুহূর্তে তাদেরকে আমরা কোন জায়গায় সরিয়ে নিতে পারি, তাও ঠিক করে রেখেছি। এখানকার পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ আবাস ভূমি, যেসব স্থানে মানুষের সংখ্যা বেশি, সে বিষয়েও আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি।’ তিনি বলেন,‘অতিবর্ষণের কারণে যাতে পাহাড় ধসে না যায়, সেজন্য পাহাড় না কাটার ক্ষেত্রে প্রশাসনিকভাবে এ জেলার সব নির্বাহী ম্যাজিস্টেট্র এবং পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বান্দরবান জেলায় কোনোভাবেই কেউ যাতে  পাহাড় কাটতে না পারে, পাথর উত্তোলন করতে না পারে এবং পাহাড়ের কোনও রকম ক্ষতি করতে না পারে, তাও বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসক জানান, সামনের দিনগুলোতে পাহাড় ধসের কারণে যাতে কোনও ধরনের প্রাণহানির ঘটনা না ঘটে, সেজন্য প্রশাসন থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি তথ্যমতে পাহাড় ধসে পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০১৭ সালে ১৬৮জনের প্রাণহানি ঘটে আর আহত হয় ২২৭ জন। পাহাড় ধসে ১৭ সালে ৩ হাজার ৭৫টি বাড়ি সম্পূর্ণ ৩৬ হাজার ৬৩৭টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে অপিরকল্পিত গাছ কাটা, পাহাড় কাটা আর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাড়িঘর নির্মাণের ফলে প্রতিবছরই পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেই চলেছে আর এই পাহাড় ধস থেকে পরিত্রাণ পেতে এখনই কার্যকরী ব্যবস্থা না নিলে অদূর ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে ।
স্থানীয়রা জানান, পার্বত্য এলাকায় পাহাড় ধসের হাত থেকে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় শুধু আশ্বাস নয়, এখনই প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিতে হবে মহাপরিকল্পনা।

এই বিভাগের আরও খবর

  রোয়াংছড়িতে ৩৪৪ জন মা ও শিশু পেল পুষ্টিকর খাবার হরলিস ও ডিপ্লোমা গুঁড়ো দুধ

  রুমা সাংগু কলেজকে সরকারিকরণের চূড়ান্ত অনুমোদনঃ শোভাযাত্রা ও মিষ্টি বিতরণ

  বান্দরবানে মোবাইল কোর্টের অভিযানঃ ২৭ হাজার টাকা জরিমানা

  নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারলে জাতিগোষ্ঠী ও দেশের পরিবর্তন আনা সম্ভব-খুশিরায় ত্রিপুরা

  বঙ্গবন্ধু মুক্তির সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন বলেই আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি-বীর বাহাদুর এমপি

  থানচিতে ঈদুল আযাহা উপলক্ষে ভিজিএফ চাল পেল ১৬শত ৩৫ পরিবার

  বান্দরবান অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ

  লামায় ড্রেন থেকে লাশ উদ্ধার; পরিবারের দাবী খুন

  নাইক্ষ্যংছড়ির মিয়ানমার সীমান্তে গুলিবিদ্ধ বন্য হাতি

  বান্দরবানে ও যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়েছে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস

  লামায় উপজেলা প্রশাসন ও আওয়ামীলীগের উদ্যোগে জাতীয় শোক দিবস পালিত

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

অনগ্রসর বিবেচনায় নারী, নৃগোষ্ঠীদের জন্য জন্য সরকারি চাকরিতে যে কোটা রয়েছে, তা তুলে দেওয়ার পক্ষে মত জানিয়ে কোটা পর্যালোচনা কমিটির প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেছেন, অনগ্রসররা এখন অগ্রসর হয়ে গেছে। আপনি কি তার সঙ্গে একমত?